—শর্মিষ্ঠা রায়
ঊনবিংশ শতকের অবিভক্ত বাংলায় মানবহিতৈষী, নির্ভীক, আপন মনোবলে অটুট এবং স্বাধীনচেতা যে মহামানবের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছে তিনি পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। অবিভক্ত বাংলায় তিনি ছিলেন বিধাতার আশীর্বাদ স্বরূপ। তিনি একাধারে দয়ার সাগর, জ্ঞানের সাগর, হাস্যরসিক, খ্যাতকীর্তি সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক, বলিষ্ঠ চেতনার অগ্রদূত হিসেবে আজও বাংলার ঘরে ঘরে সমাদৃত। ১৮২০ সালে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও স্বীয় প্রতিভা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি পৃথিবীর বরেণ্য ব্যক্তিদের মাঝে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এই প্রবন্ধে স্বল্প পরিসরে তাঁর সংস্কারমূলক কার্যক্রমের মূল দু’টি বিষয় আলেচিত হয়েছে—নারীশিক্ষা বিস্তার ও বিধবা বিবাহ প্রচলন। প্রবন্ধের মূল বক্তব্য উপস্থাপনের পূর্বে তাঁর প্রতিভা ও কর্মজীবন সম্পর্কে দু’একটি কথা উল্লেখ করছি।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক অনন্য সাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মাত্র তিন বছরে তিনি পাঠশালার পাঠ সাঙ্গ করেন। পাঠশালায় শিক্ষাগুরু কালীকান্ত বালক বিদ্যাসাগরের বুদ্ধিমত্তা ও ধী-শক্তি দেখে প্রায়ই বলতেন, ‘এ বালক ভবিষ্যতে বড় লোক হবে’। পাঠশালার লেখাপড়া শেষ করে মাত্র ন’ বৎসর বয়সে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য কোলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। তিনি অন্যান্য ছাত্র অপেক্ষা অল্প বয়সী ছিলেন। ব্যাকরণ বিদ্যায় তাঁর অস্বাভাবিক ব্যুৎপত্তি ছিল। দ্বাদশ বর্ষে তিনি সংস্কৃত কলেজের কাব্য শ্রেণীতে প্রবেশ করেন। তাঁর অদ্ভুত ধী-শক্তির পরিচয় পেয়ে অধ্যাপকমণ্ডলী বিস্মিত হতেন। সংস্কৃত অনুবাদেও তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। তিনি অনর্গল সংস্কৃতে কথা বলতে পারতেন। তদানীন্তন পণ্ডিতগণ তাঁর স্মৃতিশক্তি এবং অশ্রুতপূর্ব বাক্য বিন্যাস ক্ষমতা দেখে মোহিত হয়ে বলতেন, “এ বালক পৃথিবীতে অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইবে”।১ অসীম ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায়ের সাথে তিনি সংস্কৃত কলেজে বার বছর বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং কৃতিত্বের সাথে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর মেধা ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে শিক্ষকমন্ডলী তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ফলে তিনি সকলের কাছে বিদ্যাসাগর নামে পরিচিত হন।
ছাত্র জীবনের সফল সমাপ্তির পর ১৮৪১ সালে তিনি লাল দিঘির ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগের সেরেস্তাদারের (প্রধান পণ্ডিত) পদে নিযুক্ত হলেন।২ ১৮৪১ থেকে ১৮৪৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় চার বছর চার মাস কাল তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে একটানা সেরেস্তাদারি করেন। তারপর প্রায় এক বছর তিন মাস (৬ই এপ্রিল ১৮৪৬ থেকে ১৬ই জুলাই ১৮৪৭ পর্যন্ত) সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদকের কাজ করেন। পরে আবার প্রায় এক বছর আট মাস (১লা মার্চ ১৮৪৯ থেকে ৪ঠা ডিসেম্বর ১৮৫০ পর্যন্ত) ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেড রাইটার ও কোষাধ্যক্ষের কাজ করেন। একবার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, একবার সংস্কৃত কলেজ, এইভাবে তাঁর প্রথম কর্মজীবন প্রধানত চাকুরীর টানাটানিতেই কেটে যায়। অবশেষে ১৮৫০ সালের ৫ই ডিসেম্বর তিনি সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন এবং তার এক মাস কয়েকদিন পরেই (১৮৫১ সালের ২২শে জানুয়ারী) কলেজের অধ্যক্ষের পদ লাভ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র একত্রিশ বছর। এই সময় থেকেই তাঁর কর্মজীবনের মধ্যাহ্নের শুরু। মধ্যের একুশ থেকে একত্রিশ পর্যন্ত দশটি মূল্যবান বছর তিনি যে কেবল সরকারী চাকুরী করে অপচয় করেছেন তা নয়। বাইরের বৃহত্তর সমাজের পাঠশালায় তিনি তাঁর কর্মজীবনের শিক্ষানবীশি করেছেন।৩
সাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি বাংলা গদ্য সাহিত্যের জনক। তাঁর রচিত সাহিত্য তাঁর কর্মজীবনের প্রক্ষেপ মাত্র। প্রথমে পাঠ্য পুস্তকের অভাব পুরণের জন্য তিনি লেখনী ধারণ করেন। তাঁর লেখনী ‘বর্ণ পরিচয়’ থেকে যাত্রা শুরু করে, ‘সীতার বনবাসে’ গিয়ে উপনীত হয়। সংস্কৃত পাঠ্য পুস্তকের অভাব লক্ষ্য করেও তিনি সংস্কৃত উপক্রমনিকা এবং সংস্কৃত গ্রন্থের বিবিধ সংকলন করেন। শুধু তাই নয়, মহাভারতের বঙ্গানুবাদের সূত্রপাত ও শব্দ সংগ্রহের চেষ্টার মূলেও রয়েছে তাঁর কার্যসম্পাদনী বুদ্ধি।৪
১৮৫৯ সালে তিনি চাকরী ছেড়ে দেন এবং মেট্রোপলিটান স্কুলের পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। ১৮৭২ সালে সেখানে একটি কলেজ বিভাগ খোলেন। ১৮৭৯ সালে তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে অধিষ্ঠিত করেন। বর্তমানে এটিই ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ নামে পরিচিত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ সংস্কার ও সমাজ পূণর্গঠনে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা মূলতঃ সমাজ বিপ্লবীর। টুলো পণ্ডিতের ঘরে জন্মগ্রহণ করে এবং সংস্কৃত কলেজের পুরাতন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থায় লালিত হয়েও বিদ্যাসগর শীর্ষস্থানীয় সমাজ সংস্কারক হিসেবে এদেশে পরিচিত হয়েছেন।৫ তিনি ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী। জগতকে মিথ্যা মনে করে, জগতের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে, জাগতিক কর্মকাণ্ডকে অকিঞ্চিৎকর ভেবে বাঙালী কখনও অশিক্ষা ও কুসংস্কারের অচলায়তন ভেদ করে উন্নত জাতি হিসেবে বেড়ে উঠতে পারবেনা- এ ছিল বিদ্যাসাগরের বিশ্বাস। এ বিশ্বাসের জোরেই তিনি ভারতীয় দর্শনের প্রধান ধারা বেদান্তকে আঘাত করতে পিছ- পা হননি। তাঁর কাছে মানুষের জীবনই বড় এবং এ জীবনই সত্য, পরকালের অলীক মায়া নয়। এই জীবনবাদী চেতনাই তাঁর সমগ্র কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করেছিল।৬
তিনি জাত-পাত সংস্কার মানতেন না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তিনি ধর্ম সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন। তাই বলে তিনি কখনোই নাস্তিক ছিলেন না। সেকালের মনীষীগণের মতে তিনি ধর্ম সচেতন ছিলেন না। হর প্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর বাল্যকালের একটি স্মৃতির বিবরণ দেন—
একদিন সকালে উঠিয়াই শুনি মেয়ে মহলে খুব সোরগোল উঠিয়াছে। ওমা এমনতো কখনো শুনিনি, বামুনের ছেলে অমৃতলাল মিত্তিরের পাত থেকে রুই মাছের মাথাটা কেড়ে খেয়েছে। কেউ বলিল ঘোর কলি, কেউ বলিল সব একাকার হয়ে যাবে, কেউ বলিল জাত-জন্ম আর থাকবেনা। আমি মাকে জিজ্ঞেস করিলাম কে কেড়ে খেয়েছে? মা বললেন, জানিসনি ...? বিদ্যাসাগর।
এই হলো বিদ্যাসাগরের আসল চেহারা।৭ তিনি নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের পাশে আলোকবর্তিকা হাতে এসে দাঁড়ান। সমাজে তাদের স্থান করে দেবার জন্য তিনি দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন।
আলোচ্য প্রবন্ধে তাঁর সংস্কারমূলক তৎপরতার প্রধান দুটি দিক ‘শিক্ষার মাধ্যমে নারী মুক্তি’ ও ‘বিধবা বিবাহ প্রচলন’ সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো—
এদেশে নারী শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যাসাগরের অবদান অতুলনীয়। তিনি বুঝেছিলেন, পরিবারের প্রাণ হচ্ছে নারী। উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত সত্যাশ্রয়ী মাতাই সন্তানের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে জেনেই শিক্ষা বিস্তারের কাজে তিনি নারী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন।৮ পরিবারই হলো একটি আদর্শ বিদ্যালয়। স্বাস্থ্য-পুষ্টি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রোগ-ব্যাধির হাত থেকে রক্ষার উপায় ইত্যাদি বিষয়ের শিক্ষা প্রধানত পরিবারেই সর্বপ্রথম দেওয়া হয়। আর সেই পরিবারের শিক্ষিকা হলেন মা। কাজেই মা যদি সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হন তাহলে তিনি তার সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারবেন। সর্বোপরি পুরুষ-শাসিত সমাজে শিক্ষিতা নারী তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হবেন। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে বিদ্যাসাগর সে সময় নারী শিক্ষা প্রসারে অবতীর্ণ হন। সেই সময় মেয়েদের সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ ছিল না। তারা ছিল অবহেলিত। বিদ্যাসাগর অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো বিস্তার ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাই তিনি নারী-শিক্ষা বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। নারী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টা বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। এক্ষেত্রে তাঁর কার্যক্রমের দুটি স্তর লক্ষণীয়ঃ (ক) জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সহকারী হিসাবে কলকাতায় স্ত্রী শিক্ষা প্রচলনের প্রচেষ্টা ও (খ) গ্রামাঞ্চলে বালিকা-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার মাধ্যমে সমগ্র দেশে ব্যাপকভাবে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের অক্লান্ত প্রয়াস।
ড্রিংকওয়াটার বেথুন এদেশে এসে হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন যে, নারী জাতিকে শিক্ষিত করে না তুলতে পারলে এদেশবাসী কখনও কুসংস্কারের নিগড় থেকে মুক্তি পাবে না। তাই নারী শিক্ষা প্রচলনের মহৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে বেথুন নব্য বঙ্গের রাম গোপাল ঘোষ, জমিদার দক্ষিণা রঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ও পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালংকারের সহায়তায় ১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই মে তারিখে মাত্র ২১ জন বালিকা নিয়ে ‘কলিকাতা বালিকা বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন।৯ স্কুল প্রতিষ্ঠার পরেই বেথুন সাহেব বিদ্যাসাগরকে স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তার অবৈতনিক সম্পাদক রূপে কাজ করার জন্য অনুরোধ করেন। বিদ্যাসাগর সাগ্রহে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।১০ সে সময় সমাজে নারী শিক্ষাকে ভাল চোখে দেখা হতো না। সর্বসাধারণের বিশ্বাস ছিল নারীরা শিক্ষিত হলে বিধবা হবে, জাত থাকবে না ইত্যাদি। বিদ্যাসাগর জানতেন শাস্ত্রের দোহাই না দিলে এদেশের জনগণকে কিছুই বোঝানো যাবে না। তাই বেথুন সাহেব যখন দূর থেকে ছাত্রীদের স্কুলে আনা নেওয়ার জন্য ঘোড়ার গাড়ীর ব্যবস্থা করেছিলেন, সম্পাদক হিসাবে বিদ্যাসাগর সেই গাড়ীর পাশে “কন্যাপ্যেবং পালনীয়া শিক্ষনীয়াতিযত্নতঃ” এই শাস্ত্র বচনটি খোদাই করে দেন। বাক্যটির অর্থ, পুত্রের মত কন্যাকেও যত্ন করে পালন করতে ও শিক্ষা দিতে হবে।১১ কিন্তু মেয়েদের শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় হিন্দু নেতাদের নিকট থেকে প্রচণ্ড বাধা আসে। এ ব্যাপারে বেথুন সাহেব বড় লাট ডালহৌসীকে মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে একখানি পত্র লিখেন। বেথুনের পত্রে সুফল ফলেছিল। বড়লাট ডালহৌসী ১লা এপ্রিল ১৮৫০ সালে বেথুনের বক্তব্য যুক্তিসংগত বলে স্বীকার করেন এবং নারী শিক্ষা প্রচলনের ব্যাপারে তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকারও করেন।১২
সারাদেশে স্ত্রী শিক্ষা বা নারী শিক্ষা বিস্তারের আগ্রহ বিদ্যাসাগরের এত বেশী ছিল যে, এ ব্যাপারে সরকারের শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতিকে তিনি কর্তৃপক্ষের জনকল্যাণমূলক প্রচেষ্টা বলে ভুল করলেন। তাই ১৮৫৪ খ্রীষ্টাব্দের ‘এডুকেশন ডেসপ্যাচে’ স্ত্রী শিক্ষার সমর্থন এবং ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের গোড়ার দিকে স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারে বাংলার ছোটলাট হ্যালিডে সাহেবের আগ্রহকে সম্বল করে বিদ্যাসাগর গ্রামাঞ্চলে নারী-শিক্ষা প্রসারের কাজে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। তাই কয়েকদিনের মধ্যেই বর্ধমান জেলার জৌ-গ্রামে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে তিনি ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের ৩০শে মে তারিখে ডি. পি. আই. কে জানালে তিনি বিদ্যালয়টির জন্য মাসিক ৩২ টাকা মঞ্জুর করেন। নভেম্বর ১৮৫৭ থেকে মে ১৮৫৮ এই সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর হুগলী জেলায় ২০টি, বর্ধমান জেলায় ১১টি, মেদিনীপুর জেলায় ৩টি ও নদীয়া জেলায় ১টি, মোট ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয়গুলোর মোট ছাত্রী সংখ্যা ছিল ১৩০০ এবং এগুলো চালাতে মাসিক ধার্য হলো ৮৪৫.০০ টাকা।
সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য বিদ্যাসাগর বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্যের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু পূর্বাহ্নে অনুমতি না নেওয়া ও সিপাহী বিদ্রোহজনিত অর্থাভাবের অজুহাতে সরকার বিদ্যালয়গুলোতে অর্থ মঞ্জুর করতে রাজী হলেন না।১৩
বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম বন্ধু দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ‘সোম প্রকাশ’ পত্রিকায় বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সমালোচনা করে বলেন যে স্বদেশের হিতানুষ্ঠানের ব্যাপার হলে বিদ্যাসাগরের কোন জ্ঞানগম্যি থাকতোনা। বর্তমানটাই তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠতো। ভবিষ্যৎ তিনি বিশেষ চিন্তা করতেন না। বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের সময়ও তিনি তাই করেছিলেন এবং ভেবেছিলেন ছোট লাটের সমর্থনই যথেষ্ট। দুভাবনার কোন কারণ নেই। কিন্তু দুভাবনার কারণ যখন দেখা দিল তখন তিনি একেবারেই হতাশ না হলেও ব্যথিত হলেন। ১৮৫৮ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ করেন। আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও নানা রকম দুর্ভাবনার মধ্যেও বিদ্যাসাগর তাঁর বালিকা বিদ্যালয়গুলির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে একেবারে নিরাশ হননি। স্কুলগুলো পরিচালনার জন্য তিনি একটি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাণ্ডার খোলেন। এই প্রতিষ্ঠানে পাইক পাড়ার রাজা প্রতাপ চন্দ্র সিংহ প্রমুখ বহু সম্ভ্রান্ত ও উচ্চতম সরকারী কর্মচারী নিয়মিত চাঁদা দিতেন। ছোট লাট বিডন সাহেবও মাসিক ৫৫ টাকা সাহায্য করতেন। এইভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নিয়ে তিনি সরকারের মুখাপেক্ষী না হয়েও বালিকা বিদ্যালয়গুলি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।১৪
১৮৬৫ সালে ‘সোম প্রকাশ’ পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধে স্ত্রী শিক্ষা বা নারী শিক্ষার পাঁচটি অন্তরায় চিহ্নিত করা হয়। যেগুলো বিদ্যাসাগরকে নারী-শিক্ষা প্রসারে উৎসাহ যুগিয়েছে বলা যায়। সেই পাঁচটি অন্তরায় নিম্নরূপঃ
১। এদেশের পুরুষরাই আজ পর্যন্ত ভাল লেখাপড়া শিখতে পারেনি। সুতরাং তারা স্ত্রী-শিক্ষা সম্বন্ধে সচেতন হবে কি করে?
২। বাল্যবিবাহ প্রচলিত থাকার ফলে মেয়েরা বেশীদিন স্কুলে লেখাপড়া করতে পারে না।
৩। অল্প বেতনের লোক দিয়ে শিক্ষার কাজ চালানো যায় না।
৪। ছেলেবেলায় স্কুলে যেটুকু লেখাপড়া শেখে, বিবাহের পর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে মেয়েরা তা ভুলে যায়। এদেশের জাতিভেদ প্রথার জন্য সাধারণত উপযুক্ত পাত্রে মেয়েদের বিবাহ হয় না এবং সেইজন্য বিবাহের আগে তাদের যে যৎকিঞ্চিৎ শিক্ষা হয় তা বৃথা হয়ে যায়।
৫। ইউরোপের মেয়েরা নিজেরা রান্না-বান্না করে না, হোটেলে খায়। সুতরাং তাদের লেখাপড়া করার অবসর আছে। কিন্তু এদেশের মেয়েদের যেহেতু গৃহকর্ম ও রান্না-বান্না করতে হয়, সেই কারণে তারা লেখাপড়ায় মন দেওয়ার সুযোগ পায় না।
‘সোম প্রকাশের’ এই পাঁচটি অন্তরায়ের মধ্যে দ্বিতীয় ও চতুর্থটি প্রবল সামাজিক অন্তরায়। বাল্যবিবাহ ও জাতিভেদ প্রথা স্ত্রী শিক্ষার অগ্রগতির পথে প্রচণ্ড বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।১৫
শুধু তাই নয় স্ত্রী শিক্ষা বা নারী শিক্ষার পক্ষে যাঁরা বড় বড় কথা বলতেন তাঁরা নিজেদের পরিবারের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো দুরে থাক, গৃহে পর্যন্ত শিক্ষা দিতে নারাজ ছিলেন।
নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি প্রধান অন্তরায় ছিল এদেশীয় শিক্ষিকার অভাব। মিস মেরী কার্পেন্টার এই অভাব দুর করতে চেষ্টার ত্রুটি করেননি। তিনি দেশীয় শিক্ষয়িত্রী গড়ে তোলার জন্য বিদ্যাসাগরের সহায়তায় বঙ্গদেশে একটি স্ত্রী নর্মাল স্কুল স্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু যে সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া করাটাকেই খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হতো সেখানে ব্রাহ্মিকা মহিলা বা খ্রীষ্টান শিক্ষিকাদের নিকট মেয়ে পাঠিয়ে লেখাপড়া শেখানোর কথা সমাজপতিরা ভাবতেই পারতেন না। সমাজের সাধারণের ধারণা ছিল এদের কাছে মেয়েদের লেখাপড়া শিখতে দিলে তারা জাত হারাবে। এই সমস্যা বাংলা সরকারের কাছে স্ত্রী নর্মাল বিদ্যালয় পরিচালনার সময় একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ‘স্ত্রী নর্মাল বিদ্যালয়’ স্থাপনে সরকারী সমর্থন পেলেও মিস ক্যার্পেন্টার জনগণের সহযোগিতা পাননি। অবশেষে ‘নর্মাল স্কুল’ উঠিয়ে দেওয়া হল।
কয়েক বছরের বাকযুদ্ধের অবসান হলো ১৮৭২ সালের জানুয়ারী মাসে। বেথুন বিদ্যালয়ের কাজ আগের মতই চলতে থাকল ধীরে ধীরে। দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, দুর্গামোহন দাস, আনন্দ মোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ তরুণ ব্রাহ্ম যুবকরা স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারের আন্দোলনকে ব্যাপক ও শক্তিশালী করবার জন্য বিশেষ উদ্যোগী হলেন। এঁদের আন্দোলনের ফলে ১৮৭৮ সালে সর্ব প্রথম কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পরীক্ষা দেবার অধিকার স্বীকৃত হল। ১৮৭৮ সালের ২৭শে এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভায় এই মর্মে প্রস্তাব পাশ হলঃ That the female candidates be admitted to the university examination subject to certain rules”. স্ত্রী শিক্ষার অগ্রগতির একটা বড় বাধা দূর হল। কুসংস্কারের তবে অন্তরায় দুর হতে আরো অনেকদিন সময় লেগেছিল।১৬
শুধু নারী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেই নয়, বিধবা বিবাহ প্রচলন ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগর নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। প্রাচীন হিন্দু সমাজে নারীর মর্যাদা একেবারেই ভূ-লুণ্ঠিত ছিল। সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের পর হিন্দু বিধবারা সহ মরণের হাত থেকে রেহাই পেলেও বৈধব্যের কঠোর জ্বালা তাদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছিল। প্রাচীন হিন্দু সম্প্রদায়ে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াটা পরম পুণ্য বলে বিবেচিত হতো। যার ফলে অল্প বয়সী মেয়েদের প্রায়শঃই অধিক বয়সী পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দেওয়া হতো। এই সমস্ত মেয়েরা বেশীর ভাগই যৌবন প্রাপ্তির সাথে সাথে স্বামীকে হারিয়ে সারা জীবন বৈধ্যব্যের অভিশাপ বয়ে বেড়াত। অনেক বিধবাই আশ্রয় ও নিরাপত্তার অভাবে পরিবার ও সমাজের গলগ্রহ হয়ে উঠত, আবার অনেকেই জীবনের তাগিদে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতো।
বিধবা পত্নী কঠোর ব্রক্ষ্মচর্য পালন করবে-এটাই ছিল সে সমাজের রীতি। বৈধব্যের যে কি জ্বালা তা সেকালের সমাজপতিরা অনুধাবন করতে না পারলেও বিদ্যাসাগরের প্রাণ তাদের জন্য কেঁদেছিল। তাদের কষ্ট তাঁকে আহত করেছিল। বিধবা বিবাহের প্রচলন কেন হলো সে সম্বন্ধে স্বয়ং বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁর স্বগ্রামবাসী স্নেহভাজন শ্রীযুক্ত শশিভূষণ সিংহ মহাশয়কে যা বলেছিলেন তা এখানে উদ্ধৃত হলো—
‘বীর সিংহ গ্রামে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের একটি বাল্যসহচরী ছিলো। এই সহচরী তাঁহার কোন প্রতিবেশীর কন্যা। বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহাকে বড় ভালবাসতেন। বালিকাটি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট সর্বদা থাকিত। বিদ্যাসাগর মহাশয় যখন কলিকাতায় পড়িতে আসেন, তখন বালিকার বিবাহ হয়, কিন্তু বিবাহের কয়েক মাসের মধ্যেই তাহার বৈধব্য ঘটে। বালিকাটি বিধবা হইবার পর বিদ্যাসাগর মহাশয় কলেজের ছুটিতে বাড়ীতে গিয়াছিলেন। বাড়ী যাইলে তিনি প্রত্যেক প্রতিবেশীর ঘরে ঘরে গিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন, কে কি খাইলো? ইহাই তাহার স্বভাব ছিল। এবার গিয়া জানিতে পারিলেন তাঁহার বাল্য সহচরী কিছু খায় নাই। সেদিন তাহার একাদশী, বিধবাকে খাইতে নাই। একথা শুনিয়া বিদ্যাসাগর কাঁদিয়া ফেলিলেন। সেইদিন হইতে তাঁহার সংকল্প হইল বিধবার এ দুঃখ মোচন করিব। যদি বাঁচি তবে যাহা হয়, একটা করিব।১৭
অনেক ভেবে চিন্তে স্থির করলেন যে এর একমাত্র উপায় হলো বিধবাদের পুনরায় বিবাহ দান। এতেই তাদের মুক্তি। বিধবাদের বিয়ে হবে— সমাজ যেন তা অবলীলায় মেনে নিতে পারলো না। গোঁড়া হিন্দু সমাজ বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। কিন্তু বিদ্যাসাগরও হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন। অদম্য সাহস বুকে বেঁধে তিনি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। সেই সংগ্রামের হাতিয়ার ছিল শাস্ত্র বচন। তিনি ছিলেন জ্ঞানী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত। তাই বিধবা বিবাহ প্রচলনের যথার্থতা নিরূপণ করতে গিয়ে তিনি শাস্ত্রের আশ্রয় নিলেন। তিনি জানতেন গোঁড়া হিন্দু সমাজ যুক্তি মানেনা, মানে শাস্ত্র। শাস্ত্রে আছে—
নষ্টে মৃতে প্রবজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ।
পঞ্চস্বাপৎসু নারীনাং পতিরন্যা বিধীয়তে।
অর্থাৎ পাঁচটি অবস্থায় হিন্দু নারীর পুনর্বিবাহ হতে পারে। এই পাঁচটি অবস্থা হলো-স্বামী যদি দুশ্চরিত্র হয়, যদি তার মৃত্যু হয়, যদি সে পরিব্রাজক হয়, কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত বা নিখোঁজ হয় বা যদি সে ন-পুংসক হয় তখন স্ত্রীর দ্বিতীয় বিবাহ আইনগত।
বিধবা বিবাহের এটাই অকাট্য প্রমাণ হিসাবে অবলম্বন করে তিনি লেখনী ধরলেন, ঘরে ঘরে আন্দোলন গড়ে তুললেন।১৮ ১৮৫৫ সালের জানুয়ারী মাসে ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ নামে একখানি পুস্তিকা বিদ্যাসাগরের স্বনামে প্রকাশিত হয়, যাতে তিনি পরাশরের স্মৃতি গ্রন্থের শ্লোক “(নষ্টে মৃত প্রবজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ। পঞ্চ স্বাপস্ নারীনাং পরিরন্যো বিধীয়তে।”) উদ্ধৃত করে বিধবা বিবাহ শাস্ত্র সংগত ও বৈধ প্রমাণ করেন। এটি অতি ক্ষুদ্র পুস্তিকা। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ের পক্ষে ও বিপক্ষে, বহু পুস্তিকা প্রকাশিত হয়, বিপক্ষেই জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। এর কয়েক মাস পরেই ১৮৫৫ সালের অক্টোবর মাসে অধিকতর বিস্তারিতভাবে ও বিশ্লেষণ করে ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব, দ্বিতীয় পুস্তক’ প্রকাশিত হয়। যাঁরা বিধবা বিবাহের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং সেই কারণে শত্রুতা করার জন্য তাঁকে অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে পুস্তিকা প্রচার করেছিলেন, তারাই তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের অভিযোগ এনেছিলেন। তাদের অযৌক্তিক ও হীন আক্রমণের যথোপযুক্ত জবাব দেবার জন্য বিদ্যাসাগর নানা শাস্ত্র সংহিতা স্মৃতি থেকে প্রচুর উপাদান সংগ্রহ করে · অসাধারণ যুক্তিবুদ্ধির ব্যূহ রচনা করে দ্বিতীয় পুস্তক প্রকাশ করেন।
বিধবা বিবাহ আন্দোলনে জড়িয়ে তিনি ঋণগ্রস্থ হয়েছেন, আত্মীয়দেরও স্নেহ ও আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অনেক ধূর্ত ব্যক্তি তাঁকে প্রতারণা করে নিঃশেষ করেছে।১৯ তাঁর আন্দোলনকে জাগিয়ে রাখার জন্য তিনি ছদ্মনামে পত্রিকা প্রকাশ করতে লাগলেন। শুধু তাই নয়, তিনি যে বৎসর সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল পদ পরিত্যাগ করেন সেই সময় হুগলী জেলার মধ্যে কতকগুলি গ্রামে নিজ ব্যয়ে ১৫টি বিধবার বিবাহ দেন। অনেক পুনর্বিবাহিত বিধবাদের ভরণপোষণ এবং সংরক্ষণের জন্য অনেক অর্থ ব্যয় হয়। এর জন্য তিনি ঋণগ্রস্তও হন।২০ সে সময় বিদ্যাসাগরের নাম হয়েছিল “বিধবার বিয়ে দেওয়া বিদ্যাসাগর।”
শাস্ত্র, সামাজিক রীতি-নীতি, বিদ্যাসাগরের অনুকূলে কখনোই ছিল না। এগুলো লংঘন করা ছিল দুঃসাধ্য। তবুও এই সমস্ত রীতি-নীতি ভেঙ্গে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তাতে শেষ পর্যন্ত জনমত গঠনে সক্ষম হন।২১ বিদ্যাসাগরের পক্ষে প্রায় পঁচিশ হাজার ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে একাধিক আবেদন পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই আবেদনপত্রগুলি ব্যবস্থাপক সভায় প্রেরিত হয়েছিল। অবশ্য রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের নেতৃত্বে পঞ্চাশ হাজার ব্যক্তির স্বাক্ষরযুক্ত প্রতিবাদ পত্রও ব্যবস্থাপক সভায় প্রেরিত হয়েছিল। কিন্তু আইন প্রণেতারা তা গ্রাহ্য করেননি। বিদ্যাসাগরের পক্ষে বহু মান্যগণ্য ব্যক্তি-পণ্ডিত, বিচারপতি, অধ্যাপক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সমাজপতি, ভূস্বামী সম্প্রদায় (বর্ধমান ও কৃষ্ণনগরের মহারাজারা বিদ্যাসাগরের বিশেষ সহায়ক ছিলেন) এই আবেদনপত্রে সানন্দে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। এটি ১৮৫৫ সালে ৪ঠা অক্টোবর ব্যবস্থাপক সভায় প্রেরিত হয়। গ্রান্ট সাহেব নিজে তৎপর হয়েছিলেন বলে বিরোধী পক্ষের সমস্ত বাদ-প্রতিবাদ তুচ্ছ করে বিদ্যাসাগরের পক্ষীয়দের অনুকূলে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাশ করিয়েছিলেন। ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই সভায় হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন ১৮৫৬ পাশ হয়।২২ আইনের ধারা অনুযায়ী হিন্দু বিধবাদের পুনরায় বিবাহের অনুমতি প্ৰদান করা হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য নিজ পুত্রের সাথে বিধবার বিয়ে দিয়ে সমাজের জনগণকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেন।
বিধবা বিবাহের যাবতীয় ঝুঁকি বিদ্যাসাগর একাকী নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। পিতা ঠাকুরদাস পুত্রকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন ‘বাবা করিবার পূর্বে ভাবা উচিৎ। ধরেছো ছেড়োনা, প্রাণ পর্যন্ত স্বীকার করিও’। বিদ্যাসাগর তাই করেছিলেন। সর্বস্ব পণ করে সর্বনাশের শেষ সীমায় পৌঁছেছিলেন। এই ব্যাপারে ৪০-৫০ হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি শেষ জীবনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। তিনি যতই বাধা পেয়েছিলেন ততই দৃঢ়তর বিক্রমে ছদ্মবেশী বন্ধু, প্রতিকূল শত্রু এবং মুঢ় দেশাচারের বিরুদ্ধে শাস্ত্র ও যুক্তির অস্ত্র ধারণ করে প্রায় একাকী সংগ্রাম করে গেছেন।২৩
একটি সমাজের যথার্থ ও পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে তখনই যখন পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজকে সমানাধিকার প্রদান করা হয়, নারী সমাজকে অশিক্ষার অন্ধকারে ফেলে রেখে বা সামাজিক বিধি নিষেধের বেড়াজালে আটক রেখে কখনই সমাজের সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয়- এ সত্য উনিশ শতকেই বিদ্যাসাগর অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। পুরোহিত প্রাধান্য, কুসংস্কার শাসিত সমাজে ব্যক্তির অধিকার বিশেষ করে নারী জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিদ্যাসাগর তাঁর সমস্ত জীবনই উৎসর্গ করে গেছেন। বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে, বিধবা বিবাহ ও স্ত্রী শিক্ষার পক্ষে আন্দোলনের সময় তিনি দেখেছেন এবং প্রত্যক্ষ বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছেন যে, ‘সংস্কার কুসংস্কার হলেও তা সংস্কার’। দু-চার পুরুষে বা দু-তিন শতাব্দীতেও কেবল বুদ্ধিগম্য একটা উন্নত আদর্শের জোরে তা উন্মূলন করা যায় না।২৪ তাই বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও তৎকালীন সমাজবোধ থেকে প্রাপ্ত বিদ্যাসাগরের বাস্তব ভবিষ্যৎবাণীর যথার্থতা আমরা বর্ণে বর্ণে উপলব্ধি করতে পারছি। বিদ্যাসাগর সে যুগে সমাজ সংস্কারের দীপ্ত চেতনা নিয়ে কাজে নেমেছিলেন তার থেকে সমাজ কিছুটা এগিয়ে গেলেও সত্যিই কি সেই সমাজ নারীর পুরোপুরি মর্যাদা দিতে সক্ষম হয়েছে? যদি তাই হতো তাহলে বাংলার মেয়েরা আজ এতখানি পিছিয়ে থাকতোনা। বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলন করে গেলেন বটে কিন্তু আজ অবধি সমাজ কতটা বিধবা মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পেরেছে তাদের স্বাদ-আহলাদ। কয়জন তরুণ এগিয়ে এসেছে বিধবার হাত ধরে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে? হাতে গোনা জনা-কয়েক ছাড়া আজো আমাদের দেশে অসংখ্য বিধবা বৈধব্যের কঠোর জ্বালা নিয়ে কালাতিপাত করছে, তাদের অসহায়ত্ব বাধ্য করছে এক শ্রেণীর লোকের লালসার শিকার হতে। যারা বিধবা বিবাহের সপক্ষে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বড় বড় বুলি আওড়ায় তারাই আবার লোক লজ্জার ভয়ে ব্যক্তিগত জীবনে বিধবাদের সেই হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে পিছপা হয়।
শুধু বিধবা বিবাহ ক্ষেত্রেই নয়, স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তৎকালীন সমাজে যে সমস্ত বাধা- বিপত্তি প্রবল ছিল, কিছুটা শিথিল হলেও সেগুলোর অস্তিত্ব আজও আমাদের গ্রাম বাংলায় পরিলক্ষিত হয়। এদেশের মেয়েরা আজও রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে কিনা, অথবা কতটুকু পর্যন্ত শিখবে তা নির্ধারণের ভার অভিভাবকের উপর ন্যস্ত। পর্দা প্রথা, বাল্য বিবাহ এখনো মেয়েদের শিক্ষার পথে প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। তাইতো আমাদের দেশে মহিলার সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হওয়া সত্বেও শিক্ষা-দীক্ষায় তারা পুরুষদের সমকক্ষ হতে পারেনি। এদেশে যেখানে পুরুষ শিক্ষিতের হার ৩০.২ শতাংশ সেখানে নারী শিক্ষিতের হার মাত্র ১৯.২ শতাংশ (১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী)২৫। এই রিপোর্টই প্রমাণ করে নারী-পুরুষের বৈষম্যকে সমাজ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিদ্যাসাগর তাঁর জীবদ্দশায় নারী মুক্তি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি তাদের মুক্তির পথ খুলে দিয়ে গেছেন।
বর্তমান অবস্থাই মনে করিয়ে দেয় নতুন করে নারী জাতির অবস্থার মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। তাদেরকে ন্যায্য অধিকার দিতে না পারলে জাতির উন্নতি কখনো সম্ভব নয়। তাই সরকারের আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়াও সর্বাগ্রে যে জিনিসটি প্রয়োজন তাহলো জনচেতনা। জনগণকে সংগঠিত করতে না পারলে, তাদের মধ্য থেকে কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস দুর করতে না পারলে, সর্বোপরি পুরুষরা যদি প্রভুসুলভ মনোভাব পরিহার করতে না পারে তাহলে একা বিদ্যাসাগর যেমন পারেননি, তেমনি আর কারো পক্ষেই এই অসাধ্য সাধন সম্ভব নয়।
‘বীরসিংহের সিংহ পুরুষ বিদ্যাসাগর’ এই একটি মাত্র চরণেই বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। তাঁর সমাজ চেতনায় দীক্ষা লাভ করে আজ সমাজের প্রতিটি সচেতন ব্যক্তিকে নারী সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সচেষ্ট হওয়া একান্ত আবশ্যক। আজ এই উপমহাদেশে তথা বাঙালী সমাজে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে অহরহ নারী নির্যাতন পরিলক্ষিত হয়। নারীর মুক্তি ছাড়া মানব জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কারমূলক কর্মের মধ্যে ‘নারী শিক্ষা’ ও ‘বিধবা বিবাহ প্রচলন’ সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুটি কার্যকরী উদাহরণ হিসাবে আজও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব এই আদর্শকে সাফল্যমণ্ডিত করে নারী উন্নয়নের পথ উন্মোচন করা, যা দেশ ও জাতির উন্নয়নে প্রভূত সহায়তা করবে।
১.↩ বিহারী লাল সরকার, বিদ্যাসাগর, (কলিকাতাঃ নবপত্র প্রকাশক, ১৯৯৫) পৃ. ৪০-৪৩।
২.↩ বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ (কলিকাতাঃ ওরিয়েন্ট লংম্যান, লিমিটেড, ১৯৭৩), পৃ. ১১০।
৩.↩ তদেব, পৃ. ১১৮।
৪.↩ প্রমথনাথ বিশী, বিদ্যাসাগর রচনা সম্ভার (কলিকাতাঃ মিত্র ও ঘোষ, ১৩৬৪), পৃ. ১১।
৫.↩ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর (কলিকাতাঃ মন্ডল বুক হাউস, ১৯৭০), পৃ. ১৬৬।
৬.↩ মকবুল আহমেদ,তদেব, “মানব দরদী বিদ্যাসাগর,” শিক্ষাবার্তা, ৬ষ্ঠ সংখ্যা ১৯৯১, পৃ. ১১৭।
৭.↩ বিশী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪।।
৮.↩ আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।
৯.↩ খন্দকার সিরাজুল হক, “বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাব্রতী বিদ্যাসাগর”, পাণ্ডুলিপি, তৃতীয় খণ্ড, বাংলা সাহিত্য সমিতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৩, পৃ. ৮০-৮১।
১০.↩ ঘোষ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৮।
১১.↩ তদেব, পৃ. ২১৮।
১২.↩ তদেব, পৃ. ২১৯।
১৩.↩ হক, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪-৮৫।
১৪.↩ ঘোষ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৬।
১৫.↩ তদেব, পৃ. ২২৮।
১৬.↩ তদেব, পৃ. ২৩৬-৩৭।
১৭.↩ সরকার, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৪।
১৮.↩ তদেব, পৃ. ২২৩।
১৯.↩ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭১।
২০.↩ সরকার, প্রাগুক্ত, পৃ. ২২৩।
২১.↩ N. S. Bose Indian Awakening and Bengal (Calcutta: Firma KLM, 1976). P. 213.
২২.↩ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৭।
২৩.↩ দেব কুমার বসু, বিদ্যাসাগর রচনাবলী, ২য় খণ্ড, , (কলিকাতাঃ মণ্ডল বুক হউস, ১৯৭০), পৃ. ৪৪-৪৫।
২৪.↩ ঘোষ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৮।
২৫.↩ BBS, Bangladesh Educational Statistics, 1991, (Dhaka, BBS, 1992) P. 185.
আহমেদ, মকবুল, ১৯৯১ : “মানবদরদী বিদ্যাসাগর”, শিক্ষাবার্তা, ৬ষ্ঠ সংখ্যা,
ঘোষ, বিনয় ১৯৭৩ : বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, কলিকাতাঃ ওরিয়েন্ট লংম্যান লিমিটেড।
বসু, দেবকুমার ১৯৭০ঃ বিদ্যাসাগর রচনাবলী, ২য় খণ্ড, কলিকাতাঃ মণ্ডল বুক হাউস।
বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত কুমার, ১৯৭০ : বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর, কলিকাতাঃ মণ্ডল বুক হাউস।
বিশী, প্রমথ নাথ ১৯৬৪: বিদ্যাসাগর রচনা সম্ভার, কলিকাতাঃ মিত্র ও ঘোষ।
হক, খন্দকার সিরাজুল, ১৯৭৩ঃ “বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষাব্রতী বিদ্যাসাগর” পাণ্ডুলিপি, তৃতীয় খণ্ড, বাংলা সাহিত্য সমিতি চট্টগ্রাম।
সরকার, বিহারী লাল, ১৮৯৫ঃ বিদ্যাসাগর, কলিকাতাঃ নবপত্র প্রকাশক।
BBS Bangladesh Educational Statistics 1991, Dhaka, BBS
Bose, N. S. 1970 : Indian Awakening and Bengal, Calcutta: Firma KLM Ltd.
এপ্রিল ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত।

কোন মন্তব্য নেই
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন