মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

১৮৭২ সালের জুন মাসে হিন্দু বিধবাদের সাহায্যার্থে ‘হিন্দু ফ্যামিলি অ্যান্যুইটি ফান্ড’ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কেননা, স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু নারীর আর্থিক অনটনের দৈন্যদশা প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে তাঁকে। তখন পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার ছিল না। দেশভাগের পর নানা অন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতে এ-বিষয়ে হিন্দু আইনের সংস্কার করা হলেও বাংলাদেশে অতিসম্প্রতি (২০২০ সালে) পাশ হয় স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার। বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবর্ষে এই আইন পাশ হওয়া —হয়তো এ-ঘটনাটি কাকতালীয়!

—ফারজানা সিদ্দিকা



১৮৫০-এ সর্ব্বশুভকরী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় বিদ্যাসাগরের ‘বাল্যবিবাহের দোষ’। সেখানে সৃষ্টিকর্তা যে জগতের সকল প্রাণীর মধ্যেই নারী ও পুরুষ সৃষ্টি করে সমতা বিধান করেছেন এবং মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই যে বিবাহের প্রচলন ছিল না, সে-বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। বিবাহের উৎস সম্পর্কে লিখেছেন, ‘জগৎসৃষ্টির কত কাল পরে মনুষ্যজাতির এই বিবাহসম্বন্ধের নিয়ম চলিত হইয়াছে, যদ্যপি তদ্বিশেষ নির্দেশ করা অতি দুরূহ, তথাপি এইমাত্র উল্লেখ করা যাইতে পারে, যখন মনুষ্যমণ্ডলীতে বৈষয়িক জ্ঞানের কিঞ্চিৎ নির্মলতা ও রাজনীতির কিঞ্চিৎ প্রবলতা হইতে আরম্ভ হইল এবং যখন আত্মপরবিবেক, স্নেহ, দয়া, বাৎসল্য, মমতাভিমান ব্যতিরেকে সংসারযাত্রার সুনির্বাহ হয় না, বিবাহসম্বন্ধই ঐ সকলের প্রধান কারণ, ইত্যাকার বোধ সকলের অন্তঃকরণে উদয় হইতে লাগিল, তখনি দাম্পত্য সম্বন্ধ অর্থাৎ বিবাহের নিয়ম সংস্থাপিত হইয়াছিল সন্দেহ নাই।’ লক্ষ করা যেতে পারে, ‘মনুষ্যমণ্ডলীতে বৈষয়িক জ্ঞানের কিঞ্চিৎ নির্মলতা ও রাজনীতির কিঞ্চিৎ প্রবলতা’ —এ দুটি দিক নিয়ে। এই প্রবন্ধের ৩৪ বছর পর ১৮৮৪-এ প্রকাশ পেয়েছে ফ্রেডরিখ অ্যাঙ্গেলসের পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি —সমাজতান্ত্রিক নারীবাদের গোড়াপত্তন হয়েছে যে গ্রন্থের আলোকে— সেখানেও ব্যক্তিগত মালিকানাতে পরিবার ও রাষ্ট্রের উৎস সন্ধানে নারীর বিশ্ব-ঐতিহাসিক পরাজয়ের পেছনে সম্পদ বা সম্পত্তি বিষয়ে মানুষের, মূলত পুরুষের, বৈষয়িক জ্ঞান ও পুরুষ-আধিপত্যের রাজনীতিকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিদ্যাসাগর এবং অ্যাঙ্গেলস —দুজনেরই জন্ম ১৮২০ সালে! সতীদাহপ্রথা, বাল্যবিবাহপ্রথা বা বিধবাবিবাহের ক্ষেত্রে যে তুমুল বাধা তার সবকিছুর পেছনেই এই সম্পদের অধিকার ও পুরুষ-আধিপত্যের রাজনীতিই যে বিদ্যমান সেটি স্পষ্টতই বুঝেছিলেন ভারতবর্ষের নারীদের দুই উদ্ধারকর্তা রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০, বঙ্কিমের ১৮৩৮; উভয়ের বয়সের ব্যবধান ১৮ বছর। তাঁদের আবির্ভাবের কাল ছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক যুগান্তরের কাল। পুরনো বিশ্বাস-সংস্কারের ভূমিতে ইউরোপীয় চিন্তার বিচ্ছুরণে জাতির জীবনে ঘটছিল নানা পরিবর্তন। সমাজে সামন্ত অর্থনীতির প্রভাব তখন প্রবল; ইউরোপীয় প্রভাবে ধনতন্ত্রের বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে, জমিদারি শোষণে কৃষি অর্থনীতির ক্ষয়িষ্ণু রূপও সামনে চলে আসে। তাছাড়া যোগাযোগ-ব্যবস্থার উন্নতি, শিল্প-কারখানা স্থাপন, শিক্ষার প্রসার এবং ইউরোপীয় প্রভাবের বিচিত্র অভিঘাতে সমাজের ভিত্তিমূল নড়বড়ে হয়ে যায়। বলা চলে, তখন এক প্রকার যুগান্তরের হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছিল ভারতীয় জীবনে।

—এম আবদুল আলীম



উনিশ শতকের বাঙালি-সমাজে গভীর প্রভাবসঞ্চারী দুই মনীষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১) এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪)। আধুনিক জীবনবোধ তথা রেনেসাঁসের আলোয় আলোকিত হলেও পাণ্ডিত্য, সৃজনশীলতা, দেশ-কাল-সমাজভাবনায় দুজন ছিলেন দুই মেরুর বাসিন্দা। একজন ব্রাহ্মণ-সন্তান হয়েও ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন খড়্গহস্ত; আরেকজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং চিন্তা-মননে আধুনিক হলেও ছিলেন সমাজের শাশ্বত মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং সময় সময় ঋষির আসনে সমাসীন। উভয়ের চিন্তা-কর্মে অমিল যেমন প্রবল, তেমনি মিলও বিস্তর; একজন পরশুরামের কঠোর কুঠার হাতে ভারতীয় সমাজে দীর্ঘকাল প্রচলিত সংস্কার-কুসংস্কারের মর্মমূলে আঘাত হানতে সদা উদ্যত, আরেকজন শাণিত লেখনীর মাধ্যমে সমাজের নানা অসংগতির মূলোচ্ছেদে তৎপর। কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও সামগ্রিকভাবে এই দুই মনীষী স্বীয় চিন্তা এবং কর্মকাণ্ড দ্বারা উনিশ শতকের বাঙালি-সমাজের নানা সংস্কার সাধন করেছেন এবং সমাজের অগ্রগতি ও মানবকল্যাণে রেখেছেন অসামান্য অবদান।
গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপারে যথেষ্ট স্বাধীনতা অবলম্বন করলেও শকুন্তলার রচনা কোথাও অস্বাভাবিকতা দোষে দুষ্ট নয়, বা তার ভাষার স্বচ্ছতা এবং কাহিনীর রস কোথাও ব্যাহত হয়নি। এর কারণ হল বিদ্যাসাগরের অসাধারণ শিল্পসচেতনতা। রসের রাজা কালিদাসের রচনার সঙ্গে এখানে বিদ্যাসাগর যে আধুনিক মনোভাব, পরিমাণবোধ আর স্বাভাবিকতার সমন্বয় সাধন করেছেন, একমাত্র সৃজনধর্মী লেখকের পক্ষেই তা সম্ভব।

—পিয়াস মজিদ

১৯৭০-এর ডিসেম্বরে অর্থাৎ প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে গোলাম মুরশিদের সম্পাদনায় প্রকাশ পায় বিদ্যাসাগর সার্ধশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ বিদ্যাসাগর। ২০২০ সালে বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকীতে যখন এ-আলোচনা লিখছি তখন আমাদের হাতে রয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০১১-তে শোভাপ্রকাশ-প্রকাশিত এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ। উৎসর্গিত হয়েছে ‘বিদ্যাসাগরের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশে।’

অন্তর্ভুক্ত লেখক যথাক্রমে— আহমদ শরীফ, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, রমেন্দ্রনাথ ঘোষ, মুখলেসুর রহমান, সনৎকুমার সাহা, মযহারুল ইসলাম, বদরুদ্দীন উমর, গোলাম মুরশিদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, অজিতকুমার ঘোষ, আলী আনোয়ার। পরিশিষ্টে সংযুক্ত হয়েছে বিদ্যাসাগর-বর্ষপঞ্জি।
রামমোহন ও বিদ্যাসাগর দুজনে রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ হলেও তাঁদের সামজিক অবস্থানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল। সমাজের উচ্চকোটির লোক রামমোহন গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে বহুদূরে বসবাসকারী একজন অনুপস্থিত ভূস্বামী ছিলেন। জমিদার হিসেবে তিনি হিসেবি ছিলেন। রামমোহন-জীবনীকার নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর বইতে রামমোহনের কিছু হস্তাক্ষরের নমুনা দিতে গিয়ে তাঁর সেরেস্তা থেকে কিছু চিঠি উদ্ধৃত করেছেন। এতে জানা যাচ্ছে যে, খাজনা বকেয়া থাকলে রামমোহন রায়ের কর্মচারীরা জমির ফসল আটকে রাখতো। রামমোহন রায় চিঠি দিলে তাঁরা খাজনা নিয়ে ফসল ছাড়তো। তিনি তাঁর সময়ের ভূস্বামীদের স্বার্থের প্রতিভূ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একজন বড় সমর্থক ছিলেন। অপরদিকে বিদ্যাসাগর ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এক পর্যায়ে বই বিক্রির টাকায় যথেষ্ট বিত্তশালী হলেও তিনি অন্যদের মতো জমিদারি কেনেননি। কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সংঘাত ছিল না। বর্ধমানের রাজা তাঁকে বীরসিংহ গ্রামের তালুক দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘আমার যখন এমন অবস্থা হবে যে আমি সমস্ত প্রজার খাজনা দিতে পারবো সেদিন তালুক নেব।’

—চৌধুরী মুফাদ আহমদ



‘দেশে এখন জাঁকজমজপূর্ণ শান্তির সময়। এখন চিতাবাঘের পাশে হরিণ, হাঙ্গরের পাশে মাছ, বাজের নিকটে কপোত এবং ঈগলের পাশে চড়ুই শুয়ে থাকে’— এভাবেই ফকির খাইরুদ্দিন এলাহাবাদি উনিশ শতকের প্রথম দশকের ভারতকে বর্ণনা করেছেন। ১৮০৩ সালের দিল্লির এবং মহারাষ্ট্রের অসইয়ের লড়াইয়ে মারাঠা শক্তির বিরুদ্ধে ইংরেজদের জয়ের মাধ্যমে কার্যত ভারতের স্থানীয় শক্তির বিরুদ্ধে ইংরেজদের জয় সম্পূর্ণ হয়। এর আগে মীর কাশিম, সুজাউদ্দৌলা, টিপু সুলতান প্রমুখের প্রতিরোধ ছলে-বলে-কৌশলে ইংরেজরা নস্যাৎ করেছে। দিল্লির লড়াইয়ের পর অন্ধ মোগল সম্রাট শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুরক্ষায় নামমাত্র সম্রাটে পরিণত হন এবং ভারতে দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ শাসনের পাকাপোক্ত ভিত নির্মিত হয়। এসময়ই অভিজাত মুসলমানরা মনে করেন যে, দ্বাদশ শতাব্দীর পর এই প্রথম ভারতের শাসন মুসলমানদের হাত থেকে চলে গেল। দিল্লি জামে মসজিদের ইমাম শাহ্‌ আব্দুল আজিজ লিখেছিলেন— ‘এখান (দিল্লি) থেকে কলকাতা পর্যন্ত এখন খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণে… এই দেশ আর ‘দারুল ইসলাম’ নয়।’ ছোটখাটো ঘটনা বাদ দিলে ১৮০৩ সালের পরবর্তী কয়েক দশক ছিল ভারতে ইংরেজ শাসনের অধীনে একটি সুস্থির সময়। কলকাতা তখন ইংরেজদের রাজধানী। কলকাতার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’দের কাছে এই সময়টা ছিল এক স্বস্তির সময়। ইংরেজ শাসনের প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা ও মুগ্ধতা প্রচুর। তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে, মহাজনি ব্যবসা করে প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক হচ্ছেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর কারণে পুরোনো জমিদারদের সম্পত্তি নিলাম হলে সেই জমিদারি কিনছেন, আবার সেগুলি অন্যদের কাছে পত্তন দিচ্ছেন। কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে একটি হিন্দু মধ্যশ্রেণি গড়ে উঠছে। তাদের মধ্যে ইংরেজি শেখার আকাক্সক্ষা তীব্র। এরকম একটি সময়ে কলকাতা কেন্দ্রিক বঙ্গীয় জাগরণের সূচনা এবং রামমোহন রায়ের আবির্ভাব।
রবীন্দ্রনাথের কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদের আলোচনার বিদ্যাসাগরের ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য গ্রন্থে প্রাবন্ধিক-গবেষক রাজীব সরকার লিখেছেন, ‘সংস্কৃতের ব্যাকরণ, সাহিত্য, স্মৃতিতে অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য সংস্কৃত কলেজ কর্তৃক ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত হয়েও তিনি আচরণে ‘ব্রাহ্মণত্ব’ অর্জন করলেন না।’

—সেলিম মাহমুদ



মাতৃভক্তি, শিশুদের পাঠ্যবই রচনা, দানশীলতা, বিধবা বিবাহ প্রচলন প্রভৃতি কর্মসম্পাদন দ্বারা বাঙালির মনের মণিকোঠায় বিদ্যাসাগর অবিস্মরণীয় এক সত্তা। বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে যেসব গুণপনা বহুচর্চিত,  সেগুলি হচ্ছে— বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যরীতির জনক, সমাজ-সংস্কারক, স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্তক, সৃষ্টিশীল অনুবাদক ইত্যাদি।

বাংলার শিক্ষা ও সমাজের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উন্মুক্ত ও উদার মননের প্রতীক। তাঁর বিদ্যা ও দয়া কোনোটাই ভোলার নয়।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক বক্তৃতামালায় বক্তৃতা শুরু করেছিলেন বিদ্যাসাগরের চরিত্রের অন্যতম প্রধান গুণের কথা বলে— ‘যে গুণে তিনি পল্লী আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালি জীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেদপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতায় বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া— হিন্দুত্বের দিকে নহে— করুণার অশ্রজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে আপনার দৃঢ়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন।’

—লোকমান কবীর



বেতালপঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা ওরফে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-৯১) প্রথম প্রকাশিত গদ্যসাহিত্য। হিন্দি গ্রন্থ বৈতালপচ্চিসী অবলম্বনে এটি রচিত হলেও বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশে গ্রন্থটির গুরুত্ব অপরিসীম। এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণে লেখক হিসেবে বিদ্যাসাগরের নাম লেখা ছিল না। এটি রচিত হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পাঠ্যবইয়ের সংকট দূর করার উদ্দেশ্যে। কেননা এর পূর্বে ওই কলেজে পাঠ্যবই থাকলেও দূরান্বয় ও দুর্বোধ্যতা সেসব বইকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল। দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপনে বিদ্যাসাগরের ভাষ্য থেকে আমরা জানতে পারি লেখকের নাম ও গ্রন্থ রচনার প্রেক্ষাপট :

কালেজ অব্ ফোর্ট উইলিয়ম নামক বিদ্যালয়ে, তত্রত্য ছাত্রগণের পাঠার্থে, বাংলা ভাষায় হিতোপদেশ নামে যে পুস্তক নির্দ্দিষ্ট ছিল, তাহার রচনা অতি কদর্য। বিশেষতঃ, কোনও কোনও অংশ এরূপ দুরূহ ও অসংলগ্ন যে কোনও ক্রমে অর্থবোধক ও তাৎপর্য্যগ্রহ হইয়া উঠে না। তৎপরিবর্ত্তে পুস্তকান্তর প্রচলিত করা উচিত ও আবশ্যক বিবেচনা করিয়া, উক্ত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহামতি শ্রীযুত মেজর জি. টি. মার্শল মহোদয় কোনও নূতন পুস্তক প্রস্তুত করিতে আদেশ দেন। তদনুসারে আমি বৈতালপচীসীনামক প্রসিদ্ধ হিন্দি পুস্তক অবলম্বন করিয়া এই গ্রন্থ লিখিয়াছিলাম।
বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং তাতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদানকে দেখতে হয় মোটামুটি ষাট বছরের প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ উইলিয়ম উইলবারফোর্স (১৭৫৯-১৮৩৩) থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) এমন রূপরেখা বিবেচনায়। এ কেবল দুই ভিন্ন গোলার্ধে থাকা দুজন ব্যক্তিত্বের ঐতিহাসিক অবস্থানই নয়, বরং এই দ্বিত্বে ব্রিটেন এবং ভারতবর্ষের বৃহত্তর ঐতিহাসিক বাস্তবতার হদিস মেলে।

—মহীবুল আজিজ



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চার বছর বয়সে কলকাতা থেকে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়— চার্লস লুসিংটনের দ্য হিস্ট্রি, ডিজাইন অ্যান্ড প্রেজেন্ট স্টেট অব দ্য রিলিজিয়াস, বেনেভোলেন্ট অ্যান্ড চ্যারিটেবল ইনস্টিটিউশন্স, ফাউন্ডেড বাই দ্য ব্রিটিশ ইন ক্যালকাটা অ্যান্ড ইট্‌স ভিসিনিটি। ততদিনে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমি সংস্কারের পরিণতি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে জমিদারশ্রেণির প্রজন্মান্তর ঘটে গেছে। বস্তুত ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা কোনোভাবেই স্থানীয়দের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল না, এর পুরোটাই ছিল ঔপনিবেশিক স্বার্থপুষ্ট। কোম্পানি থেকে ব্রিটিশ সরকারে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার প্রকৃতি বদলেছে; কিন্তু সেটির অভিমুখ থেকে গেছে মোটামুটি একই। প্রশ্ন উঠতে পারে, শিক্ষার মতো একটি ব্যয়সম্ভব খাতে কোম্পানি কেন তাহলে অর্থ খরচ করার সিদ্ধান্ত নিল? আসলে শিক্ষার নেপথ্যে নিহিত ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। খ্রিষ্টান বিশ্বে তখন ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট মেরুকরণের প্রক্রিয়ায় উভয় শিবিরের মধ্যে একটা পারস্পরিক প্রতিযোগিতার প্রতিবেশ বিদ্যমান, যা কখনো-কখনো দ্বান্দ্বিক পরিণামে পর্যবসিত হচ্ছিল। আমরা জানি, রানি এলিজাবেথের সঙ্গে ভ্যাটিকান চার্চের দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টবিশ্বে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের সূচনা করেছিল। কিন্তু এর পরিণতি আরো দূরপ্রসারী হয়। ১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দে রোমান ক্যাথলিক পৃষ্ঠপোষিত জেসুইট মিশনারিদের সংগঠনের সূচনা বিশ্বে খ্রিষ্টধর্মে আনুষ্ঠানিক বিভক্তির একটি মাত্রা। এর বিপরীতে আট-নয়টি দেশ যেগুলো ক্যাথলিকধারার বাইরে বেরিয়ে যায়। এসবের নেপথ্যে ছিল লাতিন বাইবেলের অনুবাদের ঘটনা। ভ্যাটিকানের দৃষ্টিতে বাইবেল যেহেতু ঈশ্বরের ভাষা সেহেতু এর অনুবাদ ব্লাসফেমিসুলভ কাজ। অন্যদিকে ক্যাথলিকবিপরীত দেশগুলো নিজ-নিজ ভাষায় বাইবেল অনুসরণকে ঈশ্বরবিশ্বাসের অনুগামী বলেই বিবেচনা করে। পরিস্থিতির নেতৃত্ব নিয়ে নেয় রানি এলিজাবেথের দেশের শাসকেরাই। এরই ধারাবাহিকতায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দুই বছরের মাথায় ১৭৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় লন্ডন মিশনারি সোসাইটি। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল ঈশ্বরের গৌরবময় বাণী ছড়িয়ে দেওয়া। এর ঠিক চার বছর পরে ১৭৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চার্চ মিশনারি সোসাইটি তথা সিএমএস। এটি মূলত একটি ব্রিটিশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিশ্বময় অ্যাংলিকান এবং প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টানদের একই ছাতার নিচে একই লক্ষ্যে কাজ করার একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন,
‘বিদ্যাসাগর প্রথমত বেথুন-সাহেবের সহায়তা করিয়া বঙ্গদেশে স্ত্রীশিক্ষার সূচনা ও বিস্তার করিয়া দেন। অবশেষে যখন তিনি বালবিধবাদের দুঃখে ব্যথিত হইয়া বিধবাবিবাহ-প্রচলনের চেষ্টা করেন তখন দেশের মধ্যে সংস্কৃত শ্লোক ও বাংলা গালি মিশ্রিত এক তুমুল কলকোলাহল উত্থিত হইল। সেই মুষলধারে শাস্ত্র ও গালি-বর্ষণের মধ্যে এই ব্রাহ্মণবীর বিজয়ী হইয়া বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত প্রমাণ করিলেন এবং তাহা রাজবিধিসম্মত করিয়া লইলেন।’ ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নকে লেখা চিঠিতে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘বিধবাবিবাহ প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম। এ জন্মে যে ইহা অপেক্ষা অধিকতর আর কোনও সৎকর্ম করিতে পারিব তাহার সম্ভাবনা নাই।’

—সৌভিক রেজা



অধ্যাপক অশোক সেন মনে করতেন যে, ‘নানা গরমিলে শিক্ষিতজনের আগাপাশতলায় স্ববিরোধের অভাব নেই।’ কথাটি খুবই সত্যি বলে মনে হয়। সেই অশোক সেনই বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘Vidyasagar loved his ego responsibly, conceived of it as a social task, and was greedless in its pursuance; such were his bonafides.’ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘দয়ার সাগর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। মধুসূদন দত্ত যে লিখেছিলেন—
  
     বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
 করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
          দীন যে, দীনের বন্ধু! উজ্জ্বল জগতে
 হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যক্ষ জি টি মার্শাল সাহেবের পরামর্শে ১৮৪৭ সালে তিনি হিন্দি বৈতালপচ্চিসীর বাংলা অনুবাদ করেন। আমাদের আলোচ্য এই গ্রন্থটি। প্রসঙ্গত, বিদ্যাসাগর-প্রতিষ্ঠিত ‘সংস্কৃত ডিপজিটরি প্রেস’ থেকে ওই মার্শাল সাহেবের অনুরোধে তিনি কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি থেকে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের মূল পুথি এনে প্রকাশ করেন অন্নদামঙ্গল কাব্য। এটি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সিভিলিয়ানদের পাঠ্যপুস্তক ছিল এবং প্রিয় গ্রন্থটির পাঠদান করতেন বিদ্যাসাগর স্বয়ং। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ছয়শো টাকা দিয়ে কলেজের জন্য একশ অন্নদামঙ্গল পুস্তক ক্রয় করে, যার দ্বারা বিদ্যাসাগর প্রেসের যাবতীয় ঋণও পরিশোধ করেছিলেন।

—জ্যোৎস্না চট্টোপাধ্যায়



ঊনবিংশ শতকের পরাধীন ভারত। এরই মধ্যে নবজাগরণের তরঙ্গে জেগে উঠেছিল বিবিধ চিন্তন। শিক্ষা, সমাজসংস্কার, নারীমুক্তির ভাবনায় ব্যাপৃত সমাজের একদল মানুষ দীর্ঘদিন পালিত অন্ধ কুসংস্কার ও প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; তাঁর জন্ম ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে মেদিনীপুর (তৎকালীন হুগলী জেলা) জেলার বীরসিংহ গ্রামে। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা ভগবতী দেবী। কর্মসূত্রে ঠাকুরদাস থাকতেন কলকাতায়। কলকাতা আর গ্রামে তাঁর যাতায়াত চলত। বিদ্যাসাগরের বিদ্যাচর্চা গড়ে উঠেছিল যে উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে সেটি জানা দরকার। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি উইলিয়াম কেরি তাঁর দুই সহযোগী উইলিয়াম ওয়ার্ড ও জোসুয়া মার্শসম্যানের সাহায্যে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যতম সহযোগী ছিলেন হানা মার্শম্যানও। ইংরেজ সিভিলিয়ানদের এদেশীয় ভাষা শিক্ষার জন্য কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হলো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ১০ই জুলাই ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নবীন বিদ্যার্থীদের বাংলা ভাষা পড়তে ও লিখতে শেখার উদ্দেশ্য নিয়ে বর্ণপরিচয় প্রণয়ন করেছেন। তিনি এগিয়েছেন আরোহী পদ্ধতিতে। পুস্তকের প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগে অপেক্ষাকৃত সহজ থেকে কঠিন পাঠের দিকে গিয়েছেন। এই লেখায় ভাষা-শিক্ষণের উপকরণ হিসেবে বর্ণপরিচয়ের রচনা-কৌশল ও বৈশিষ্ট্য খুঁজে দেখা হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে কিছু মন্তব্য ও মূল্যায়নও করা হয়েছে— শিশুর ভাষাশিক্ষার নতুন পুস্তক প্রণয়নে যেগুলো বিবেচনায় নেওয়া যায়।

—তারিক মনজুর



শিশু সহজাতভাবেই মুখের ভাষা আয়ত্ত করে ফেলে; অর্থাৎ কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই মাতৃভাষায় কথা বলতে শিখে যায়। কিন্তু ভাষার পঠন ও লিখন দক্ষতা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে ঘটে। এই পঠন ও লিখন দক্ষতা যত দ্রুত তৈরি করা সম্ভব হয়, তত দ্রুত শিক্ষার্থীকে কার্যকরভাবে অন্য বিষয়ের পাঠের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়। বিশ্বজুড়ে এটি বড় চ্যালেঞ্জ— কীভাবে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের স্কুল শিক্ষার্থীদের দ্রুততার সঙ্গে পড়তে ও লিখতে শেখানো যায়।

ভাষা-শিক্ষণের একটি প্রক্রিয়ায় প্রথমে বর্ণ শেখানো হয়; এরপর শব্দ ও বাক্যের পর্যায়ে যাওয়া হয়। একে বলে আরোহী পদ্ধতি। বিপরীত পদ্ধতিকে বলে অবরোহী পদ্ধতি— যেখানে আগে বাক্য শোনানো ও পড়ানো হয়; পরবর্তী ধাপে শব্দ ও বর্ণ শেখানো হয়। অবরোহী পদ্ধতিতে শিশু বেশ তাড়াতাড়ি পড়তে শিখে যায়; কিন্তু তার পঠনে প্রচুর ভুল হতে থাকে। অবরোহী পদ্ধতির সুবিধা-অসুবিধা লক্ষ করে এখন অধিকাংশ ভাষা-শিক্ষণ প্রক্রিয়া এগোয় মিশ্র পদ্ধতিতে।
vidyasagar.info ©