মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

গত দুইশ বছরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে অসংখ্য আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তিনি নিজের কালে যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি তার বিরোধীপক্ষ সমালোচনার তিরে তাকে বিদ্ধ করতেও পিছপা হয়নি। বিরোধীপক্ষের লেখায় ও কথায় জর্জরিত হয়েছেন তিনি। নানাভাবে তাকে আঘাত করার চেষ্টা হয়েছে। তাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু তিনি পিছপা হননি নিজের দায়িত্ব থেকে। যা তিনি সমাজের ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক মনে করেছেন, তা বাস্তবায়নে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম পণ্ডিত নিযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে কর্মজীবন, তা শেষ হয় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। এর পর আমৃত্যু (মৃত্যু ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট) তিনি সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি ব্যস্ত ছিলেন বই লেখা ও বই ছাপার কাজে। কথিত আছে যে, সিপাহী বিদ্রোহের সময় অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া কলেজে সেনানিবাস স্থাপনের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন।

—মামুন রশীদ



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে জানেন না, তার সম্পর্কে শোনেননি— এমন বাঙালির সংখ্যা বিরল। ইতোমধ্যে আমরা জন্মের দ্বিশতবর্ষ পেরিয়ে এসেছি। অথচ দুইশ বছরেও তার কীর্তি ম্লান হয়নি। তাই স্বকালে যেমন তেমনি উত্তরকালেও বিদ্যাসাগর আলোচিত এবং আলোকিত।

যতো দিন যাচ্ছে, তিনি আরও স্বমহিমাণ্ডিত হয়ে উঠছেন। তার কীর্তিই তাকে আলোচনায় রেখেছে। সমাজে ও দেশের মানুষের মাঝে, অন্ধ-অজ্ঞ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে জাগিয়ে তুলতে যে আলো তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সে আলোতেই কেটেছে আঁধার। সে আলোর রেখা ধরেই এগিয়ে চলা।
বিধবাবিবাহ সংগঠিত করতে গিয়ে বারবার প্রতারিত হয়ে পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি লিখছেন, “আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।” এই পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও (স্যর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা) চলে গেলেন ১৮৭০ সালে।

—সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়



সাল ১৮৭৫, তারিখ ৩১ মে। স্থান কলকাতা। গভীর রাত।

অভিমানে ক্ষতবিক্ষত এক জন আমহার্স্ট স্ট্রিটের ৬৩ নম্বর বাড়িতে দোতলার একটি ঘরে বসে নিজের হাতে লিখছেন তাঁর ইচ্ছাপত্র বা উইল। তাঁকে শুধু তাঁর একমাত্র পুত্র বা পরিবার আহত করেনি, তাঁকে রক্তাক্ত করেছে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, ইংরেজ শাসক, সেই শাসকদের করুণা-লোভী জমিদার শ্রেণির বাবু সম্প্রদায়, এমনকী তাঁর পরম আরাধ্যা জননী। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সেই উইল লিখছেন তিনি।

পঁচিশটি অনুচ্ছেদে সম্পূর্ণ এই উইল। এতে রয়েছে তাঁর নিজের সম্পত্তির তালিকা, পঁয়তাল্লিশ জন নরনারীকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক বৃত্তি দেবার নির্দেশ। এর মধ্যে ছাব্বিশ জন তাঁর অনাত্মীয়। এ ছাড়াও ব্যবস্থা আছে দাতব্য চিকিৎসালয় ও মায়ের নামে স্থাপিত বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য। সব থেকে বিস্ময়কর পঁচিশ নম্বর অনুচ্ছেদ।
রামমোহন কিংবা বিদ্যাসাগরের কর্মক্ষেত্র হিন্দুসমাজেই নিবদ্ধ ছিল। এমন কি শিক্ষাবিস্তার ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগর মুসলিম জনশিক্ষার দায়িত্ব নেন নি। কিন্তু এ জন্যে বিদ্যাসাগরকে দায়ী করা চলবে না। প্রথমত, এঁদের শিক্ষা-সমস্যা কিংবা সমাজ-সমস্যা নিবদ্ধ ছিল কোলকাতা ও তার চতুস্পার্শস্থ জেলাগুলোর উচ্চবর্ণের শিক্ষিত সমাজে। ইংরেজি শিক্ষাবিমুখ স্বসমাজের মানুষের সমস্যাও তাঁদের বিচলিত করে নি। দ্বিতীয়ত, সে যুগে বৈষয়িক বা আর্থনীতিক ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের সঙ্গে উচ্চবর্ণের ও উচ্চ বিত্তের হিন্দুসমাজের মধ্যযুগীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনীতিক যোগসূত্র প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তৃতীয়ত, বিদ্যাসাগরের সমকালে নওয়াব আবদুল লতিফ প্রমুখের নেতৃত্বে মুসলিম-শিক্ষাপদ্ধতি সম্বন্ধে তখনো অস্থির বিচার বিবেচনা চলছে। আবদুল লতিফ স্বয়ং ছিলেন উর্দুভাষী এবং বিদেশাগত উচ্চবিত্তের উর্দুভাষী মুসলিম পরিবারগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। তাঁর বাঙলা-বিরোধী সুস্পষ্ট উক্তি রয়েছে। তিনি ছিলেন মুসলমানের মাতৃভাষারূপে উর্দু প্রর্বতনের দাবীদার এবং দেশজ নিম্নবিত্তের মুসলমানদের জন্যেও তিনি বিশুদ্ধ বাঙলা কামনা করেন নি— চেয়েছিলেন নিদেনপক্ষে সন্ধিকালের জন্যে সাময়িকভাবে আরবি-ফারসি-মিশ্রিত দোভাষী রীতির বাঙলার প্রচলন, যাতে উত্তরকালে মাতৃভাষারূপে উর্দু গ্রহণ করা সহজ হয়। এমন অবস্থায় বিদ্যাসাগরের পক্ষে মুসলমানের জন্যেও বাঙলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাপ্রয়াস সম্ভব ছিল না, তাঁর সে অধিকারই ছিল না।

—আহমদ শরীফ



বিদ্যাসাগরকে দেখিনি। শুনে শুনেই তাঁকে জেনেছি। ভালই হয়েছে। দেখলে তাঁকে খণ্ড খণ্ড ভাবেই পেতাম। শুনে শুনে তাঁকে অখণ্ডভাবে সমগ্ররূপে পেয়েছি। কেননা; চোখের দেখা হারিয়ে যায়। অনুধ্যানে পাওয়াই চিরপ্রাপ্তি, সেই পাওয়া যেমন অনন্য, তার স্থিতি যেমন মর্মমূলে, তেমনি তার রূপও সামগ্রিক।

উনিশ শতকী বাঙলায় অনেক কৃতীপুরুষ জন্মেছিলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের দান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব কিছুর মূলে ছিলেন দুই অসামান্য পুরুষ। প্রথমে রামমোহন, পরে ঈশ্বরচন্দ্র। একজন রাজা, অপরজন সাগর। উভয়েই ছিলেন বিদ্রোহী। পিতৃ-ধর্ম ও পিতৃ-সমাজ অবজ্ঞাত ও উপেক্ষিত হয়েছে উভয়ের কাছেই। তাঁদের দ্রোহ ছিল পিতৃকূলের ধর্ম ও সমাজের, জাতি ও নীতির, আচার ও আচরণের বিরুদ্ধে।

উভয়েই ছিলেন পাশ্চাত্য প্রজ্ঞায় প্রবুব্ধ। জগৎ ও জীবনকে তাঁরা সাদা চোখে দেখবার, জানবার ও বুঝবার প্রয়াসী ছিলেন। বিষয়ীর বুদ্ধি ছিল তাঁদের পুঁজি। সমকালীন জনারণ্যে তাঁরা ছিলেন individual, ব্যক্তিত্বই তাঁদের চরিত্র। তাই তাঁরা ছিলেন চির-একা। তাঁদের কেউ সহযাত্রী ছিল না— বন্ধু ছিল না, সহযোগী ছিল না। তাই তাঁরা কেউ সেনাপতি নন, সংগ্রামী সৈনিক। অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর দুঃসাহসই তাঁদের সম্বল। নতুন করে গড়ব স্বদেশ— এ ছিল আকাঙ্ক্ষা, আর একাই কাজে নেমে পড়ার দুঃসাহস। ভিমরুলের চাকে খোঁচা দেয়ার পরিণাম জেনেও হাত বাড়িয়ে দেবার সংকল্পই হচ্ছে তাঁদের ব্যক্তিত্ব। এ ব্যক্তিত্ব আত্মপ্রত্যয় ও মানব-প্রীতির সন্তান। রামমোহন ও বিদ্যাসাগরই আমাদের দেশে আধুনিক মানববাদের নকীব ও প্রবর্তক।
আমরা এর আগে ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যান্য মানুষের সঙ্গে উৎসের দিক থেকে বিদ্যাসাগরের তুলনা করে দেখিয়েছি যে, অত্যন্ত গ্রামীণ, দরিদ্র, ঐতিহ্যভিত্তিক ও ‘অনাধুনিক’ শিক্ষায় শিক্ষিত পরিবার থেকে বিদ্যাসাগর উঠে এসেছিলেন বলে তাঁর উত্থান এবং পথ-পরিক্রমা ছিল অনেকের চেয়ে অনেক কঠিন। এবারে আমরা লক্ষ করব যে, হয়তো সেই কারণেই বিদ্যাসাগরকে ছুঁতে বা তাঁর কাছে পৌঁছোতে পারতেন একেবারে নিঃস্বতম থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের, সব সম্প্রদায়ের মানুষ, ভিক্ষুক থেকে অস্পৃশ্য, ভদ্রলোক থেকে গ্রামীণ অভাবগ্রস্ত নারী-পুরুষ। তাঁর কাছে ধর্ম, সম্প্রদায়, হিন্দু-সমাজের জাতিগোত্র, শিক্ষা, বিত্ত —কিছুই কোনো বাধা ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে আর কোনো অগ্রনেতা সম্বন্ধে এমন কথা বলা যায় কি না সন্দেহ। এ-বিষয়ে অজস্র গল্প পাঠকদের জানা আছে, তার উদ্ধার প্রবন্ধের আয়তন বৃদ্ধি করবে মাত্র।

—পবিত্র সরকার



১. কী বাকি থাকে আমাদের জন্য?



যাঁরা ইতিহাস নির্মাণ করেন এবং এক সময় ইতিহাস হয়ে আমাদের থেকে দূরত্বে চলে যান, তাঁদের মধ্যে প্রধানত দু-ধরনের লোক থাকেন। এক, যাঁদের কথা আমরা ইতিহাস বইয়ে পড়ি, কিন্তু যাঁরা ওই বইয়ের পাতাতেই সমাধিস্থ থাকেন। তাঁদের অনেকের নাম ও বিবরণ আমাদের পাঠ্য মাত্র, মুখস্থ করার এবং (পরীক্ষার পরে, বহুলাংশে) ভুলে যাওয়ার বিষয়। এরকম হাজারো নামে ইতিহাস এবং অন্যান্য আখ্যান ছেয়ে আছে।

আবার কিছু নাম নাছোড়বান্দার মতো আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না। মানুষের শিশুর জীবন, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন যেহেতু একটা ‘হয়ে-ওঠা’র সরণিতে ফেলে দেওয়া হয়, এবং সবাইকে একটা শিক্ষাগত, আর্থনীতিক এবং সামাজিক সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়, সেহেতু সেই সিঁড়ির শেষে অনেকগুলি প্রতিকৃতি ঝোলানো থাকে মানবশিশুর দেখার জন্য। ইংরেজি ভাষায় আজকাল যাকে ‘রোল মডেল’ বলা হয় তাঁদের প্রতিকৃতি। বাঙালি শিশুর জন্য বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি তার একেবারে কেন্দ্রে থাকে।

—শহীদ ইকবাল



তখন আর এখনকার কাল এক নয়। দুশো বছর পেরুল। বিদ্যাসাগরের দ্বিশতজন্মবর্ষ, কাল গুনলে দিবস-রজনীর মাপে খুব বেশি সময় নয় হয়তো। কিন্তু মানবজীবনের হিসাবে তা নেহায়েত কম বলি কী করে! তবে প্রশ্ন, এতদিন পর কেন বিদ্যাসাগর? তাঁকে কী শ্রেষ্ঠ মানুষ ভেবে, একপ্রকার বিশাল দেবমূর্তি বানিয়ে, ভক্তির ভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য— নাকি তাঁর কর্মপরিধি, কর্মের ও পাণ্ডিত্যের মেলবন্ধন যাচাইপূর্বক, আধুনিক শিক্ষার দ্বীপ জ্বেলে তিনি যে অন্ধকার দূরীভূতকরণের দায়ে, সত্য-মিথ্যা, সংস্কার-কুসংস্কারের সীমানা অতিক্রম করে মানবজাতির জন্য এক বিক্ষত প্রতিজ্ঞার ভার কাঁধে নিয়েছিলেন —নিরন্তর তীব্র হয়ে উঠেছিলেন —সে-কারণে! তিনি তো এখনো আছেন প্রজন্মান্তরে, চলমান, কে না জানে বিদ্যাসাগর কে ছিলেন? স্কুল-পাঠ্যবইয়ে, উচ্চশিক্ষায় বিদ্যাসাগরের পঠন-পাঠন তো এখনো উবে যায়নি। তবে বরঞ্চ প্রশ্নের চেয়ে জিজ্ঞাসাটা এখন শক্তিশালী হতে পারে— তাঁর মতো চিন্তার দার্ঢ্য-দৃঢ়তা কিংবা কথা ও কাজের মিল— আর সেটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি যে বরাবর দুর্মর সাহস দেখিয়েছেন —সেটা কতটা সম্ভব, অন্তত একালে বা তা কজনের রয়েছে! আমরা কতটা তার চর্চা করতে পারছি? এমন সহজলভ্য সমাজে বিদ্যাসাগরের কাজ বা দৃষ্টি তো পরিপ্রেক্ষিত পাওয়ারই কথা। সেটা কতটা পাচ্ছে! বস্তুত, তিনি যে-সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন, সেটা প্রচণ্ড স্ববিরোধী ও সদ্য বিকাশমান পুঁজির দাপটময় চঞ্চল সমাজ। মধ্যবিত্তের তখন গজাচ্ছিল ‘দাড়িগোঁফ’। তারা প্রায়শ তেতে উঠছিল, পরিবর্তনের তাড়নায়। আবার যখন দেখা যাচ্ছিল পরিবর্তনের ওপারে নিজের পরিবর্তন দরকার তখন সুযোগ বুঝে লেজ গুটিয়ে পালিয়েও যাচ্ছিল। বিদ্যাসাগরের জীবনাচরণের ভেতর দিয়ে এসব উঁকিঝুঁকি আমাদের চোখে পড়ে। আস্তিক-নাস্তিক, ঈশ্বরবাদী-নিরীশ্বর, ডিরোজিওপন্থা বা নিছক বস্তুবাদী, ভাববাদী, ধর্মরক্ষা, সমাজরক্ষা —এমন নামে-বেনামে অনেক প্রবণতা ওই সমাজে বিছানো ছিল। বিদ্যাসাগর ঘরে-বাইরে দেখছিলেন সব। কী করবেন তিনি? কী চান তিনি! এসবের মাঝে নিজেকে ঠিক কোন পরিমার্জনা দেবেন বুঝে ওঠা কঠিন ছিল। তিনিও যাদের ওপর ভরসা করেন, পান না তাদের সময়মতো, পেলেও পিছিয়ে যান, এগিয়ে চলেন, পিচ্ছিলতায় গড়ানো জীবন। বস্তুত, তিনি চলতি সমাজে দূরে বা কাছে কারোরই ভালো হতে পারেননি, আস্থাভাজনও হননি। দৈনন্দিন চলতি সমাজব্যবস্থার ভেতরে তিনি ছিলেন ‘জঞ্জাল’ —একক, আলাদা। ব্রিটিশ-শাসক বা এদেশের পণ্ডিতপ্রবর মহল তাঁকে কিছুতেই গ্রহণ করতে চায়নি। সেটি চাওয়ার কথাও নয়। কাজেই, লড়তে হয়েছে —এক অর্থে —একাই, এক হাতে, মুখোমুখি হতে হয়েছে সর্বপ্রকার শক্তির বিরুদ্ধে; সে-কারণে বিশ্বাস ও আস্থায় তাঁকে পরিষ্কার ও দৃঢ় হতে হয়েছে, কেউ যেন অযথা ভুল ধরতে না পারে, আর ভুল ধরলেও তা যুক্তিতে যেন ধরাশায়ী হয়। ফলত, যে-মতের পণ্ডিতই হোক, কেউ তাঁর কাছে দৃঢ় হতে পারেননি।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় গদ্যকে রসসমৃদ্ধ সহজগতি করেন। আগে প্রচলিত গদ্যধারা বড় বেশি নীরস, সুমধুরতাবর্জিত, কষ্টবোধক ছিল, যা পাণ্ডিত্যের দ্যোতনাই প্রকাশ করত। পাঠককুলের মহাকাশে সরস আবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হতো। বিদ্যাসাগরই প্রথম সাধু গদ্যের সরস উপস্থাপন শুরু করেন। ছন্দোময় পেলব কোমল ভাষা যা হৃদয়ে দোলা দেয়, পড়তে পড়তে বড় বেশি আপন বোধ হয় যেন। বৃষ্টির টুপটাপ বা পিয়ানোর টুংটাং যেন গদ্যে তখন। এক আপন বেগে চলা স্রোতস্বিনীর পাঠক মনে ছলাৎছল যেন!

—দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়



‘নন্দন কানন’ থেকে মানুষটা হেঁটে চলেছেন। মাথার ওপর অমলিন নীল আকাশ। পায়ের নিচে লাল মাটির বুকে জুতোর মশমশ। চাদর জড়ানো বুকের নিচে কত যে আঘাত— ক্রুশের চিহ্ন! দৃঢ়মনস্ক ঈশ্বর পথাশ্রয়ী। দূরে দাঁড়িয়ে দেহাতি মানুষগুলোর ডাক্তার দেবতা। বারে বারে আঘাতও তাঁর পরোপকারে বাধা হয়নি।

  
    পায়ে বিঁধেছে কাঁটা
         ক্ষতবক্ষে পড়েছে রক্তধারা
           নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ
              আমার নৌকোর ডাইনে বাঁয়ে
    জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে
                নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে



তবুও সর্বংসহা এক সমুদ্র প্রাণে হৃদয় ভরা। মনে মনে আউরে চলেন : ‘They alone live who live for others. The rest are more dead or alive.’
বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত শোকসভা হয়েছিল। বাংলা-ইংরেজি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল শতেক মর্মবিদারী লেখা। বলা যেতে পারে, ঈশ্বরচন্দ্রের মৃত্যু যথার্থই জাতীয় শোক ছিল। এ-শোক ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। প্রান্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এই হাজারো শোকসভার মধ্যে অপেক্ষিত ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে একটি শোকসভাও হবে। হয়েছিল। এমন জমকালো শোকসভা কলকাতার নাগরিক সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি।

—শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়



হেনরি লুই ডিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯, ১৮ এপ্রিল-১৮৩১, ২৬ ডিসেম্বর) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০, ২৬ সেপ্টেম্বর-১৮৯১, ২৯ জুলাই) বঙ্গীয় জীবনের দুই অবিস্মরণীয় চরিত্র; কিন্তু বিস্মৃতিপরায়ণ বাঙালি তাঁদের দুজনের ক্ষেত্রে একই রকম উদাসীনতার স্বাক্ষর রেখেছে তাই নিয়ে আজকের আলোচনা। আবেগ-বিহ্বল জাতি হিসেবে বাঙালি যেমন অদ্বিতীয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতাতেও তেমনি দ্বিতীয় রহিত। মৃত্যু নিয়ে তার বিহ্বলতা যেমন অতুলনীয়, স্মৃতিরক্ষার ব্যাপারে তার অকর্মণ্যতাও তেমনি লজ্জাজনক। এটা তরুণবঙ্গের পথিকৃৎ ডিরোজিওর ক্ষেত্রেও যেমন দেখা গিয়েছিল করুণা সাগর বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি।

কলেরা মরবাসে আক্রান্ত হয়ে ডিরোজিও যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ বছর আট মাস আটদিন। ছাত্রদের ‘ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড’ বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থে তাই, কাজেই তাঁকে ঘিরে যে-ছাত্রদের জীবন আবর্তিত হতো তারা নিঃসহায় হয়ে পড়েছিল। সংবাদ রত্নাকর লিখেছিল, ‘ড্রোজুর মরণে তাহারা জীবন্মৃত হইয়া থাকিবেক’ ১ — এতে একবিন্দু সন্দেহের কারণ ছিল না। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়ান নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সেই পত্রিকা তাঁর অকস্মাৎ প্রয়াণে হাহাকারের ভাষায় লিখেছিল— ‘কত আশা নিরাশায় পরিণত হয়ে গেল …অকস্মাৎ চুরি হয়ে গেল পত্রিকার সম্পাদকীয় কলমটাই’ ‘How many hopes, disappointed— how man expectations unrealized’… ২ প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন এই মহৎ প্রতিভার অকালমৃত্যুতে ইস্ট ইন্ডিয়ান সমাজের গহন ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল, যা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়, তা তারা ব্যক্ত করেছিল একটি শোকসভায় মিলিত হয়ে।
বিদ্যাসাগর ইউরোপীয় পণ্ডিত কিংবা ঔপনিবেশিক প্রকাশক —কারো কাছে নতি স্বীকার করেননি। তাঁর এই জেদি মানসিকতার কথা বলতে গিয়ে সমালোচক লিখেছেন : ‘Vidyasager rejected most of all Ballantyne’s method of searching for correspondence beween ancient Indian philosophy and European Science in order to make modern science more acceptable for Indian Pandits : ‘They are a body of men whose longstanding prejudices are unshakable.’ Instead of looking for the traditional learned of India the masses had to be educated, and the task the Sanscrit College was confronted with should be the training of capable teachers for this purpose.’ (Hiltrud Rustau, 1993 : 146)।

—বিশ্বজিৎ ঘোষ



উপনিবেশিত বাংলাদেশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের (১৮২০-৯১) জন্ম, বেড়ে ওঠা, জীবনসাধনা এবং মৃত্যু। হুগলির অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নিলেও তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় অতিবাহিত হয়েছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের শাসনাধীন ভারতবর্ষের রাজধানী শহর কলকাতায়। তাঁর কর্মস্থল প্রধানত ছিল কলকাতা, চাকরি করতেন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ম (১৭৮১) এবং সংস্কৃত কলেজে (১৮২৪), চাকরি-সূত্রে সম্পর্কিত ছিলেন ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অনেকের সঙ্গে। ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে চাকরি করতে হয়েছে স্বাধীনচেতা জেদি একরোখা বিদ্যাসাগরকে। অন্যদিকে তিনি ছিলেন সময়সতর্ক, কর্তব্যসচেতন, ন্যায়নিষ্ঠ এবং উদার মানবতাবাদী। চরিত্রের এই দ্বিমাত্রিক অথচ আপাত বিপ্রতীপ বৈশিষ্ট্যের কারণে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অনেকের সঙ্গেই তাঁর ছিল মধুর সম্পর্ক, কারো সঙ্গে সম্পর্কে ছিল অম্ল-মধুর বৈরিতা। তিনি চলতে চেয়েছেন নিজের ইচ্ছায়, —কখনো ঊর্ধ্বতন প্রশাসকদের কাছ থেকে পেয়েছেন প্রত্যাশিত আনুকূল্য, আবার কখনো-বা তাঁকে পড়তে হয়েছে দ্বন্দ্ব ও দ্বৈরথ-অর্ণবে। কিন্তু সর্বত্রই লক্ষ করা যাবে, ঔপনিবেশিক প্রশাসকের কাছে ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়ে তিনি কখনো নতি স্বীকার করেননি, নিজের জাগতিক স্বার্থকে উপেক্ষা করে তিনি সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পথে ছিলেন অটল, নিজস্ব বিবেচনায় ছিলেন সুস্থির। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সম্পর্কের এই খতিয়ান সন্ধানই বর্তমান নিবন্ধের অন্বিষ্ট বিষয়।


—রাজীব সরকার



ইউরোপীয় রেনেসাঁসের যুগকে অভিনন্দন জানিয়ে এঙ্গেলস লিখেছিলেন— ‘আজ পর্যন্ত মানুষ যা দেখেছে তার মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রগতিশীল বিপ্লব, এ যুগের প্রয়োজন ছিল অসাধারণ মানুষের এবং তার সৃষ্টিও হয়েছিল— যাঁরা ছিলেন চিন্তাশক্তি, নিষ্ঠা, চরিত্র, সর্বজনীনতা এবং বিদ্যায় অসাধারণ।’

বুর্খহার্ট তাঁর রেনেসাঁস সংক্রান্ত বিখ্যাত বইয়ে রেনেসাঁসকে ব্যক্তিপ্রতিভার বিস্ফোরণের যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উনিশ শতকের ভারতীয় রেনেসাঁসেও ব্যক্তিপ্রতিভার বিস্ফোরণের দেখা মেলে। রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত শতাব্দীব্যাপী ইতিহাসে বাংলায় যে-উজ্জ্বল প্রতিভার মিছিল দৃশ্যমান, এর তুলনা সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর নেই। ধর্ম ও সমাজসংস্কারে, শিক্ষা-দীক্ষায়, নারী উন্নয়নে, মানবসেবায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষে, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে, আধুনিক ধ্যান-ধারণায়, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে —এমন বহুমুখী জাগরণ আর কখনো দেখা যায়নি ভারতবর্ষে। ‘এমন অল্পকালের মধ্যে ভারতের মাত্র একটি জাতির (বাঙালির) মধ্যে যত মনস্বীর, যত কর্মীর, যত ভাবুকের, যত শিল্পী ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছে, ভারতের ইতিহাসেও আর ঘটেনি— অশোকের কালে নয়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে নয়, মোগল রাজত্বে— আকবরের দিনেও নয়, বৈষ্ণব আন্দোলনের বাঙলায়ও নয়।’ গোপাল হালদারের এই উক্তিতে কোনো আতিশয্য নেই।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করিয়া দেখিলে এই কথাটি মনে বারংবার উদয় হয় যে, তিনি যে বাঙালি বড় লোক ছিলেন তাহা নহে, তিনি রীতিমত হিন্দু ছিলেন তাহাও নহে, তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশি বড়ো ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন। বিদ্যাসাগরের জীবনীতে এই অনন্যসুলভ মনুষ্যত্বের প্রাচুর্যই সর্বোচ্চ গৌরবের বিষয়।’ (রবীন্দ্রনাথ ১৯০৯ : ৭)

—আহমেদ মাওলা



উনিশ শতক আমাদের বর্তমানতার মধ্যে কীভাবে, কতটা তাজাভাবে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়েছে, সেটা একটু দেখা দরকার। উনিশ শতক সম্পর্কে যে মেটান্যারেটিভস প্রচারিত-প্রতিষ্ঠিত, তা নিয়ে ঢাকার বাঙালি সমাজে কোনো ক্রিটিক্যাল রিডিং চোখে পড়ে না। কাণ্ডজ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক অভিনিবেশ দিয়েও যে পাঠ বা চর্চা করা হয়েছে, তা নয়। কলকাতায় বরং উপনিবেশ-উত্তর সময়ে কিছু জিজ্ঞাসা, আত্মসমীক্ষার সন্দর্ভ রচিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। উনিশ শতক মানেই বাঙালি রেনেসাঁস, আধুনিকতা, সমাজসংস্কার, প্রগতি— এই বিষয়গুলোর বয়ান জারি আছে। ইতিহাসের এই বয়ানগুলো কতটা কার্যকরভাবে আমাদের বর্তমানময়তার মধ্যে খুঁজে পাই? এই জিজ্ঞাসাকে সামনে রেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে (১৮২০-৯১) পাঠ এবং তাঁর দ্বিশতজন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করা হবে আমাদের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। উনিশ শতকে নবজাগরণ বা রেনেসাঁস হয়েছে কি হয়নি, এই বেহুদা আলাপে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখি না। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), ডিরোজিও (১৮০৯-৩১), রামতনু লাহিড়ী (১৮১৩-৯৮), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১), মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩), রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬-৮৬), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪), প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬), দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮-৮৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) প্রমুখ রেনেসাঁসের পুনর্জাত সন্তান। এঁরা কলকাতার আরবান জনগোষ্ঠী, উচ্চবর্ণ হিন্দু, ভদ্রলোক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, দেবেশ রায় বলেছেন, নবজাগরণ বলে যদি কিছু ঘটেও থাকে, তা এই গোষ্ঠীর মধ্যেই ঘটেছে, ইতিহাসের আকার পায়নি, মিথ আকারে থেকে গেছে। (দেবেশ ১৯৯০ : ৪৩) এই রেনেসাঁস প্রকল্পের মধ্যে ‘আদারিং’ রয়েছে। বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণি ইংরেজদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছে এবং নিশ্ছিদ্র কলোনিয়াল প্রসেসের মধ্যে এরা বিকশিত হয়েছে। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক নিম্নবর্ণের হিন্দু, সাধারণ মানুষ, কৃষক সমাজ, মুসলমান জনগোষ্ঠীর মানুষকে তারা জাগাতে পারেনি। নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং মুসলমান সমাজের জন্য নবজাগরণের কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি ছিল না।
vidyasagar.info ©