রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বিদ্যাসাগরের জীবনবৃত্তান্ত আলোচনা করিয়া দেখিলে এই কথাটি মনে বারংবার উদয় হয় যে, তিনি যে বাঙালি
বড় লোক ছিলেন তাহা নহে, তিনি রীতিমত হিন্দু ছিলেন তাহাও নহে, তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশি বড়ো ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ
ছিলেন। বিদ্যাসাগরের জীবনীতে এই অনন্যসুলভ মনুষ্যত্বের প্রাচুর্যই সর্বোচ্চ গৌরবের বিষয়।’ (রবীন্দ্রনাথ ১৯০৯ : ৭)
—আহমেদ মাওলা
উনিশ শতক আমাদের বর্তমানতার মধ্যে কীভাবে, কতটা তাজাভাবে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়েছে, সেটা একটু দেখা
দরকার। উনিশ শতক সম্পর্কে যে মেটান্যারেটিভস প্রচারিত-প্রতিষ্ঠিত, তা নিয়ে ঢাকার বাঙালি সমাজে কোনো ক্রিটিক্যাল রিডিং
চোখে পড়ে না। কাণ্ডজ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তিক অভিনিবেশ দিয়েও যে পাঠ বা চর্চা করা হয়েছে, তা নয়। কলকাতায় বরং উপনিবেশ-উত্তর
সময়ে কিছু জিজ্ঞাসা, আত্মসমীক্ষার সন্দর্ভ রচিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। উনিশ শতক মানেই বাঙালি রেনেসাঁস, আধুনিকতা,
সমাজসংস্কার, প্রগতি— এই বিষয়গুলোর বয়ান জারি আছে। ইতিহাসের এই বয়ানগুলো কতটা কার্যকরভাবে আমাদের বর্তমানময়তার মধ্যে
খুঁজে পাই? এই জিজ্ঞাসাকে সামনে রেখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে (১৮২০-৯১) পাঠ এবং তাঁর দ্বিশতজন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করা
হবে আমাদের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। উনিশ শতকে নবজাগরণ বা রেনেসাঁস হয়েছে কি হয়নি, এই বেহুদা আলাপে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন
দেখি না। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), ডিরোজিও (১৮০৯-৩১), রামতনু লাহিড়ী (১৮১৩-৯৮), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১),
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩), রামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬-৮৬), বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-৯৪), প্রিন্স দ্বারকানাথ
ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬), দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮-৮৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১),
বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) প্রমুখ রেনেসাঁসের পুনর্জাত সন্তান। এঁরা কলকাতার আরবান জনগোষ্ঠী, উচ্চবর্ণ হিন্দু, ভদ্রলোক
শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, দেবেশ রায় বলেছেন, নবজাগরণ বলে যদি কিছু ঘটেও থাকে, তা এই গোষ্ঠীর মধ্যেই ঘটেছে, ইতিহাসের আকার
পায়নি, মিথ আকারে থেকে গেছে। (দেবেশ ১৯৯০ : ৪৩) এই রেনেসাঁস প্রকল্পের মধ্যে ‘আদারিং’ রয়েছে। বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণি
ইংরেজদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছে এবং নিশ্ছিদ্র কলোনিয়াল প্রসেসের মধ্যে এরা বিকশিত হয়েছে। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক
নিম্নবর্ণের হিন্দু, সাধারণ মানুষ, কৃষক সমাজ, মুসলমান জনগোষ্ঠীর মানুষকে তারা জাগাতে পারেনি। নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং
মুসলমান সমাজের জন্য নবজাগরণের কোনো প্রকল্প বা কর্মসূচি ছিল না।