মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

আলুপটল অবশ্য বেচেননি বিদ্যাসাগর। কিন্তু বই বেচেছিলেন। নিজের বইয়ের স্বত্ত্ব প্রকাশককে বেচা নয়। রীতিমতো প্রকাশনা-ব্যবসা খুলেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র।

—আশিস পাঠক



সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদকের চাকরি তখন ছেড়ে দিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিরোধটা বেধেছিল সম্পাদক রসময় দত্তের সঙ্গে। কী ভাবে পড়ানো হবে ছাত্রদের, তাই নিয়ে। রসময়বাবু তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করতে লাগলেন আড়ালে, চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদ্যাসাগর খাবে কী! বিদ্যাসাগর শুনে বললেন, ‘রসময়বাবুকে বলো বিদ্যাসাগর আলু পটল বেচে খাবে।’

আলুপটল অবশ্য বেচেননি বিদ্যাসাগর। কিন্তু বই বেচেছিলেন। নিজের বইয়ের স্বত্ত্ব প্রকাশককে বেচা নয়। রীতিমতো প্রকাশনা-ব্যবসা খুলেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। সময়টা উনিশ শতকের মাঝামাঝি। বাণিজ্যে বাঙালি তখনও বীতরাগ। আর মুদ্রণ বা প্রকাশনার ব্যবসায় তো সে ভাবে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালি তখন আসেইনি।
বড় কাজ একাই করতে হয়
সেই সময়ে তো বটেই, এই সময়ের পক্ষেও তাঁর কাজকর্ম আচারব্যবহার খুব যে সুলভ তা নয়। আজও তিনি সময়ের থেকে এগিয়ে। যে ভাবে ভেবেছিলেন, যে কথা ভেবেছিলেন, এর কোনওটাই এখনও খুব সুলভ নয়।

—সাক্ষাৎকার: ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী



প্রশ্ন: আটপৌরে বাঙালি পোশাকে বিদ্যাসাগর ছিলেন সর্বত্রগামী। প্রবল জেদ ও আত্মসম্মানবোধ নিয়ে সরকারি চাকরি করেছেন, দ্বিরুক্তি না করে ইস্তফাও দিয়েছেন। পাঠ্যবই লিখে ছেপে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছেন, দানের জন্য ধারও করেছেন। উনিশ শতকে সমাজবদলের সব আন্দোলনেই তিনি অগ্রপথিক। এমন ব্যক্তিত্ব সমসময়ে ব্যতিক্রম। দু’শো বছর পর আজ আমরা তাঁকে কী চোখে দেখব?

শঙ্খ ঘোষ: সেই সময়ে তো বটেই, এই সময়ের পক্ষেও তাঁর কাজকর্ম আচারব্যবহার খুব যে সুলভ তা নয়। আজও তিনি সময়ের থেকে এগিয়ে। যে ভাবে ভেবেছিলেন, যে কথা ভেবেছিলেন, এর কোনওটাই এখনও খুব সুলভ নয়। সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফার প্রসঙ্গে বলি, পরে বাম সমালোচকরা তাঁর প্রতি বিরুদ্ধভাব পোষণ করলেন এই জন্য যে— বিদ্যাসাগর সিপাহিবিদ্রোহের সময় তাঁর কলেজ সরকারি কাজে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা মনে রাখলেন না যে, সেই সরকারি নির্দেশের উত্তরে বিদ্যাসাগর যে চিঠিটি লিখেছিলেন, তার প্রথমেই জানিয়েছিলেন সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছা। এক বছর পর সত্যিই ইস্তফা দিলেন, নানা অনুরোধেও তা প্রত্যাহার করলেন না।
মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক অমীমাংসিত সমস্যা আজও রয়েছে। কিন্তু মহিলাদের জন্য বিদ্যাসাগর যা করেছেন তার তুলনা হয় না। লিখছেন দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী

—দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী



বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বের পাশাপাশি বেশ কিছু প্রশাসনিক দায়িত্বও সামলেছেন। এ ক্ষেত্রে আরও কিছু সংযোজন হল। আসলে তাঁর কর্ম রূপায়ণ দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েই কর্তৃপক্ষ তাঁকে এই দায়িত্বগুলি দিতেন। ১৮৫৪ সালে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ বন্ধ করে সেখানে বোর্ড অব এগজামিনার্স স্থাপন করা হয়। তাঁকে সেখানকার এক জন সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাখা হয়। এ ছাড়া ফ্রেডারিক হ্যালিডের নির্দেশে ঠিক করা হল যে, বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এ ছাড়া বিদ্যালয় পরিদর্শকই সবরকম কর্তৃত্ব করবেন। হ্যালিডের ইচ্ছেতেই বিদ্যাসাগর সহকারী পরিদর্শকের পদ পেলেন। ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুলেরও তিনি পরিচালন সমিতির সদস্য ছিলেন। তার পরে সম্পাদক হলেন। এটাই পরবর্তীতে হিন্দু মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন হয়। এখন এখানেই বিদ্যাসাগর কলেজ।
পাত্র শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। পাত্রী কালীমতি বর্ধমানের পলাশডাঙার প্রয়াতত ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দশ বছরের বিধবা মেয়ে। দাঁড়িয়ে থেকে বিদ্যাসাগর, কনের মা লক্ষ্মীদেবীকে দিয়ে কন্যা সম্প্রদান করালেন। আন্তর্জাতিক বিধবা দিবসে লিখছেন স্বপ্নকমল সরকারশিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা থেকে জানা যায়, এই সময়ে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের পাঠাগারে সারা দিন ধরে নানা শাস্ত্র পড়তে শুরু করলেন। মাঝে এক বার শুধু খেতে উঠতেন। সালটা ১৮৫৩, শীতকাল।

—স্বপ্নকমল সরকার



উনিশ শতকের মাঝামাঝি। বীরসিংহ গ্রামে বাবা ঠাকুরদাসের সঙ্গে গ্রামের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। এমন সময়ে মা ভগবতীদেবী অকাল বিধবা পড়শি কিশোরীর দুঃখে আকুল হয়ে ঈশ্বরচন্দ্রে কাছে বিধবাদের বাঁচার উপায় জানতে চাইলেন। একই প্রশ্ন রাখলেন ঠাকুরদাসও। বিদ্যাসাগর জানালেন, এমন বিধবার আবার বিয়ে শাস্ত্র সিদ্ধ। এ বিষয়ে তাঁর বই লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু সমাজে বিরোধের আশঙ্কায় দ্বিধাগ্রস্ত। ঠাকুরদাস ও ভগবতীদেবী দু’জনেই এগিয়ে যেতে বললেন।
ছোটলাটের কাছে কড়া চিঠি লিখে ছাত্রদের জন্য সুবিচার চেয়েছিলেন। ডাক্তারি পড়ুয়াদের বৃত্তি বন্ধ থাকায় করেছিলেন আর্থিক সাহায্যও। শুভাশিস চক্রবর্তী

—শুভাশিস চক্রবর্তী



সময়টা ১৮৬২। মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি ছাত্রদের হাতে-কলমে শেখানো হত, রোগীকে কী ভাবে ওষুধ ও পথ্য দিতে হবে। ক্লাস হত রোজ সকালে। এক সকালে বনমালী চট্টোপাধ্যায় নামে এক ছাত্র নিজের মনে কাজ করছিলেন। হঠাৎ হাসপাতালের এক পরিচারকের সঙ্গে কী নিয়ে ঝগড়া শুরু। বনমালী মৌখিক হুমকিতে থেমে গেলেও, থামল না পরিচারকটি। বনমালী চলে যাওয়ার পরে সে ওষুধের ঘরে ঢুকে একটা কুইনাইনের পাত্র তুলে নিয়ে সোজা গেল তৎকালীন প্রিন্সিপাল লেক সাহেবের কাছে। অভিযোগ করল, কুইনাইন চুরি করবে বলে বনমালী পাত্রটা সরিয়ে রেখেছিল, পরিচারক এসে পড়ায় পারেনি।
ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন সত্যনিষ্ঠ একজন সাহসী মানুষ; তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তাই তিনি বলতেন এবং করতেন। সমাজে তিনি বিধবা বিবাহের জন্য দাবি তুলেছিলেন; তাঁর সে দাবি তিনি প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন। গোটা নারীজাতি এবং সমাজকে পথ দেখিয়ে নিজেও তিনি কখনো পিছিয়ে থাকেননি। নিজের একমাত্র ছেলে নারায়ণ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভব সুন্দরী নামে এক বিধবার সাথে তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন।

—ফরিদ আহমদ দুলাল



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন আজ থেকে দু’শবছর আগে। এই দু’শবছর ধরেই বিদ্যাসাগর বাঙালির জীবনে বেঁচে আছেন সরবে। জীবন, এমন এক সময়, যে সময়টাকে মানুষের কল্যাণে সঠিক ব্যবহার করতে পারলে মৃত্যু তাকে মেরে ফেলতে পারে না কোনোদিন; এবং সেখানেই জীবনের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। আমাদের অহংকার, বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি বঙ্গবন্ধুর বুকে বুলেট-মৃত্যু সেঁটে দিয়ে যারা ১৯৭৫-এ তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল; যারা দশকেরও অধিক সময় ধরে প্রতিদিন মেরে ফেলতে চেয়েছে শেখ মুজিবের নাম; তারা কি ব্যর্থ হয়ে যায়নি? তারা আজ কোথায়? ইতিহাসের কোন আঁস্তাকুড়ে ঠাঁই পেয়েছে তারা আজ? কিন্তু বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন তাঁর কীর্তি আর ত্যাগের মহিমায়। সাধারণেরা আয়ুষ্কাল ফুরালেই মরে যায়; কিন্তু কীর্তিমানেরা বেঁচে থাকেন মানুষের চিন্তায়-মননে আর সৃষ্টিশীলতায়। পৃথিবীতে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালির স্বাধীনতার সম্মান উজ্জীবিত থাকবে; ততদিন বাঙালির জাতিপিতার নাম উচ্চারিত হবে বাঙালির ঘরে ঘরে। একইভাবে বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, বাঙালি নারীর সম্মানবোধ যতদিন জাগরূক থাকবে, ততদিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম বাঙালি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে, ততদিন বাঙালিকে শরণাপন্ন হতে হবে তাঁর কাছে।
যাপিত জীবনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অসংখ্য কীর্তির পাশে বড় এক কীর্তি হচ্ছে বাংলা গদ্যভাষার আধুনিকায়ন। বলা যায়, তিনিই বাংলা গদ্যভাষায় গতি সঞ্চার করেছিলেন, আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, তিনিই বাংলা গদ্যভাষায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গদ্যের ভাষাতেও যে অদৃশ্য ছন্দ বিদ্যমান, গদ্যে প্রবহমানতার যে গতি, তা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি; এবং বাংলা ভাষায় যতিচিহ্ন ব্যবহার করে গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী গতিকে সমন্বয় করার পথ দেখিয়েছিলেন; এভাবেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়ে উঠেছিলেন বাংলা গদ্য-ভাষার এক ঈশ্বর।

—ফরিদ আহমদ দুলাল



বোধ হবার পর আনন্দ পাই এই কথা ভেবে, ‘বর্ণ পরিচয়’ দিয়ে আমার শৈশবে বর্ণ পরিচয় হয়েছিল। সেদিন কি আর জানতাম কার হাত ধরে আমার বর্ণ পরিচয়ের যাত্রা শুরু হলো? যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে পরিচয় হলো, সেদিন বুঝলাম বাংলা গদ্য-ভাষার ঈশ্বর বিদ্যাসাগরের হাত ধরে চিনেছিলাম অ-আ-ক-খ। সেদিন কিছুটা তৃপ্তির পাশাপাশি দায়বদ্ধতাও অনুভব করেছিলাম; ভেবেছিলাম ঈশ্বরের আশীর্বাদকে সম্মান করা প্রয়োজন। তাই শুদ্ধতায় ব্রতী হয়েছিলাম। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার (বর্তমান মেদিনীপুর) বীরসিংহ গ্রামে। তাঁর পৈতৃক পদবী বন্দ্যোপাধ্যায়, যা ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধির আড়ালে খোয়া যায় সময়ের গৌরবের কাছে। সংস্কৃত কলেজ থেকে ১৮৪১-এ তিনি উচ্চতর শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করেন; তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বে মুগ্ধ কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করে। পাঠ্যপুস্তকে আমরা তাঁর মাতৃভক্তির কথা পড়েছি, সেখানেই জেনেছি মাতৃআজ্ঞা পালনে কী দুর্যোগের রাতে তিনি উত্তাল দামোদর সাঁতরে পাড়ি দিয়েছিলেন। ক্রমান্বয়ে জেনেছি সমাজসংস্কারক হিসেবে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ে প্রচলিত সতীদাহ প্রথা রোধ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন শৈশবে; বিধবাবিবাহ প্রচলন এবং শিক্ষা বিস্তারে নেতৃত্ব দিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন যৌবনে। সাংবাদিক হিসেবে সমাজে প্রচলিত অবিচার-অনাচার-দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন। তিনি যে কেবল বিধবাবিবাহের পক্ষে সরব ছিলেন, তাই নয়; নিজের ছেলেকেও তিনি বিয়ে করিয়ে ছিলেন একজন বিধবা নারীকে, সমাজ-পরিপার্শ্বে প্রবল আপত্তির মুখেও। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র যখন সেই স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন, তিনি তখন নিজের সম্পত্তি থেকে পুত্রকে বঞ্চিত করে পুত্রবধূকে দান করেন।
বিধবা বিবাহ চালু প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দীর্ঘ এক পুরাণ পাঠের দিকে অগ্রসর হয়েছেন, পুস্তক রচনা করেছেন। শুধু যুক্তি দিয়ে নয়, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার দিকে মনোনিবেশ করেছেন বুঝেশুনেই। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরেছিল বাঙালি হিন্দুসমাজ। প্রকৃত অর্থে বিদ্যাসাগরের পক্ষে হিন্দু পুরাণের নতুন ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে বিধবা বিবাহ চালুকরণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করা কঠিন ছিল।

—মাজেদা মুজিব



উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মে নয় শুধু অন্যান্য ধর্মেও মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেবার প্রথা পুরনো। এই প্রথা থেকে বের হবার জন্য বিদ্যাসাগরের চেষ্টা দেখবো ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ প্রবন্ধে। নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন তেমনি নারী-পুরুষের প্রণয়ে বাল্যবিবাহ কীভাবে বাঁধ সাধে সে বিষয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন। বিদ্যাসাগরের প্রেমবোধ পুণ্য পর্যায়ের। বলাবাহুল্য, বাল্যবিবাহ নিয়ে বাংলাদেশে আইন আছে কিন্তু এখনো প্রায় ষাট শতাংশ মেয়ের বাল্যবিয়ে হয়। দেড়শো বছর আগে বিদ্যাসাগর পরিণত শরীরে পরিণত মন ও নারী-পুরুষের প্রণয়ের মধ্যে গড়ে ওঠা সংসারের কথা ভেবেছিলেন। এছাড়া একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শরীর যেমন করে উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে পারে না তেমনই এদেশীয় সাংসারিক আচারও তো তার জন্য কম কঠিন কিছু নয়!
সাগর-তর্পণ
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

বীরসিংহের সিংহশিশু!  বিদ্যাসাগর!  বীর!
উদ্‌বেলিত দয়ার সাগর-বীর্যে সুগম্ভীর!
সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
তোমায় দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।

নিঃস্ব হয়ে বিশ্বে এলে, দয়ার অবতার!
কোথাও তবু নোয়াওনি শির, জীবনে একবার!
দয়ায় স্নেহে ক্ষুদ্র দেহে বিশাল পারাবার,
সৌম্য মূর্তি তেজের স্ফূর্তি চিত্ত-চমৎকার!
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বঙ্গ সাহিত্যের রাত্রি স্তব্ধ ছিল তন্দ্রার আবেশে
অখ্যাত জড়ত্বভারে অভিভূত।  কী পুণ্য নিমেষে
তব শুভ অভ্যুদয়ে বিকীরিল প্রদীপ্ত প্রতিভা
প্রথম আশার রশ্মি নিয়ে এল প্রত্যূষের বিভা,
বঙ্গ ভারতীর ভালে পরাল প্রথম জয়টিকা।
রুদ্ধ ভাষা আঁধারের খুলিলে নিবিড় যবনিকা,
vidyasagar.info ©