মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠার সাক্ষী যে মানুষেরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বর্ধমানের এই ভূমিপুত্র। তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের পাঠগুরু, তাঁর লেখালেখির সূচনাপর্বের উৎসাহদাতা। প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশকে নিয়ে লিখছেন স্বপ্নকমল সরকার। প্রেমচন্দ্র নিজেই যে শুধু কবি ছিলেন তা নয়, ছাত্রদের ভাল কবিতা পড়ে তাদের প্রশংসা করা ও লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ায় অনুপ্রেরণা দেওয়ায় তাঁর জুড়ি ছিল না।

—স্বপ্নকমল সরকার



চলতি বছরটিতে পালিত হচ্ছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দু’শো তম জন্মবার্ষিকী। সে উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। ঈশ্বরচন্দ্রের গড়ে ওঠা এবং তার প্রতিভার বিকাশে নানা ভাবে যে মনীষীরা সাহায্য করেছিলেন তাঁদের কথাও এই সময়ের প্রেক্ষিতে বিচার করা প্রয়োজন। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠার সাক্ষী যে মানুষেরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বর্ধমানের এক ভূমিপুত্র। এক দিকে, তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের পাঠগুরু, তাঁর লেখালেখির সূচনাপর্বের উৎসাহদাতা। এমনকি, বিদ্যাসাগরের আমন্ত্রণে সুকিয়া স্ট্রিটে আয়োজিত প্রথম বিধবা বিবাহের সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানেরও সাক্ষী। তিনি উনিশ শতকের শিক্ষক ও কবি প্রেমচন্দ্র তর্কবাগীশ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের তীব্র সমালোচক‌ও ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমের সমালোচনা এতটাই মাত্রাতিরিক্ত ছিল যে, বিদ্যাসাগর কিছুটা হলেও বিরক্ত‌ হয়েছিলেন। লিখছেন গৌতম সরকার রাজপোশাক নষ্ট হয়ে যেতে পারে মনে করে শচীশচন্দ্র বাঁ হাত দিয়ে বিদ্যাসাগরকে সরিয়ে দিলেন। থতমত খেয়ে বিদ্যাসাগর চকিতে পিছু হটলেন।

—গৌতম সরকার



বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড়দা শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ছেলে শচীশচন্দ্রের বিয়ে। বিয়ে হচ্ছে সাহিত্যিক দামোদর মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে সুরেশ্বরীর সঙ্গে। শচীশচন্দ্র পাইকপাড়ার জমিদারদের কাছ থেকে পোশাক ধার করে একেবারে রাজপুত্র সেছে এসেছেন। রাজবেশে তখন বর নামছেন। রাজপোশাক নষ্ট হয়ে যেতে পারে মনে করে শচীশচন্দ্র বাঁ হাত দিয়ে বিদ্যাসাগরকে সরিয়ে দিলেন। থতমত খেয়ে বিদ্যাসাগর চকিতে পিছু হটলেন। পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ভাইপোর এমন আচরণ দেখে তিনি তো অগ্নিশর্মা, “তুমি জানো ইনি কে? ইনি বিদ্যাসাগর! এক্ষুণি ক্ষমা চাও।” মাথা নিচু করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন শচীশচন্দ্র। বঙ্কিমের এরকম শ্রদ্ধা অটুট ছিল ঈশ্বরের মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত।
উনিশ শতকের নবজাগরণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটে। এই নবজাগরণের প্রধান চরিত্র বিদ্যাসাগর। বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয় তিনি রেনেসাঁস-পুরুষ। ইহজাগতিকতা, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা, নতুন গদ্যরীতি, সমাজসংস্কার, নারীশিক্ষার প্রসার, পাঠ্যসূচি থেকে অলৌকিকতার বিলুপ্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং মানবমুখিনতার মতো বৈশিষ্ট্য; যা ইউরোপীয় রেনেসাঁসকে তুলে ধরেছিল, বিদ্যাসাগর তার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

—রাজীব সরকার



‘বাংলার রেনেসাঁস’ নামে বহুল আলোচিত ঘটনার কেন্দ্রস্থল ছিল উনিশ শতকের কলকাতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতী মনীষীদের আবির্ভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিল কলকাতা নগরী। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একটি জনপদে এত প্রতিভাবান মানুষের সম্মিলন বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত শতাব্দীব্যাপী ইতিহাসে বাংলায় যে-উজ্জ্বল প্রতিভার মিছিল দৃশ্যমান, এর তুলনা সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর নেই। ধর্ম ও সমাজসংস্কারে, শিক্ষা-দীক্ষায়, নারী উন্নয়নে, মানবসেবায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষে, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে, আধুনিক ধ্যান-ধারণায়, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন বহুমুখী জাগরণ আর কখনও দেখা যায়নি ভারতবর্ষে। গোপাল হালদার যথার্থই বলেছিলেন, ‘এমন অল্পকালের মধ্যে ভারতের মাত্র একটি জাতির (বাঙালির) মধ্যে যত মনস্বীর, যত কর্মীর, যত ভাবুকের, যত শিল্পী ও সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটেছে, ভারতের ইতিহাসেও আর ঘটেনি– অশোকের কালে নয়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়ে নয়, মোগল রাজত্বে– আকবরের দিনেও নয়, বৈষ্ণব আন্দোলনের বাঙলায়ও নয়।’ এই প্রতিভাবান ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; যাঁকে অনায়াসে রেনেসাঁস-পুরুষ আখ্যা দেওয়া যায়।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে সামান্য ধারণা রাখেন এমন সবাই অন্তত এই তথ্যটি জানেন যে, মাইকেল বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে তাঁর বন্ধু বিদ্যাসাগর তাঁকে টাকা পয়সা পাঠিয়ে উদ্ধার করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর এই দুই মহীরূহের জীবনীর অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ বিদ্যাসাগর-মধুসূদন পর্ব।


—চৌধুরী মুফাদ আহমদ



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর* মাইকেল মধুসূদন দত্তের** চেয়ে তিন বছর চার মাসের বড় ছিলেন। মধুসূদন ১৮৩৭ সালে যখন হিন্দু কলেজে ভর্তি হন তখন বিদ্যাসাগর পাশের ভবনের সংস্কৃত কলেজের ছাত্র। ১৮৪১ সালের শেষ দিকে বিদ্যাসাগর পাশ করে বেরোনো পর্যন্ত দু’জন পাশাপাশি কলেজে লেখাপড়া করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোন পরিচয় ছিল বলে জানা যায় না। থাকার কথাও নয়। দুই কলেজের ছাত্রদের অবস্থান পাশাপাশি থাকলেও তাদের মধ্যে বিরাট সামাজিক ও মানসিক ব্যবধান ছিল সংস্কৃত কলেজে বিনা বেতনে পড়তো মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের হিন্দু উচ্চবংশীয় (ব্রাহ্মণ ও বৈশ্য) ছেলেরা। আর হিন্দু কলেজে পড়তো হিন্দু উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেরা। তাদের অনেকেই জুড়ি-গাড়ি হাঁকিয়ে কলেজে আসতো। কলেজে মাসিক বেতন ছিল পাঁচ টাকা। অথচ তখন বিদ্যাসাগরের পিতার পুরো এক মাসের আয় ছিল দশ টাকা। দুই কলেজের ছাত্রদের মধ্যে মাঝে মধ্যে ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি হলেও তাদের মধ্যে তেমন যোগাযোগ বা বন্ধুত্ব সম্ভবত হতো না।
বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তনের পক্ষে ভারত সরকারের কাছে প্রেরিত গণ-আবেদনপত্রে প্রথম স্বাক্ষরটি করেন পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার। বিদ্যাসাগর অগস্ট মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেও মদনমোহন এ সময়ে নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। লিখছেন গৌতম সরকারবিধবা বিবাহের ব্যাপারে মদনমোহনের দ্বিতীয় ও প্রধান কাজ ছিল আইন পাশের পরে বিধবা বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রীর সন্ধান করা।

—গৌতম সরকার



হিন্দু রক্ষণশীল সমাজের তীব্র প্রতিবাদ, অভব্য আচরণ, সংস্কৃত ও বাংলা শ্লোকমিশ্রিত অনবরত গালি উপেক্ষা করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নাছোড় লড়াইয়ের ফলে শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই পাশ হয়ে গেল যুগান্তকারী ‘বিধবা বিবাহ আইন’। এর ফলে তৎকালীন হিন্দু সমাজে বাল্যবিধবা মেয়েদের সারা জীবন ধরে অসহ্য বৈধব্য যন্ত্রণার নিরসন ঘটল। তবে এই আন্দোলনে বিদ্যাসাগরকে সমর্থন করেন মুর্শিদাবাদবাসীর কিয়দংশ। কেননা জেলাতে সৈয়দাবাদ নিবাসী কবিরাজ গঙ্গাধর সেনের নেতৃত্বে বিরুদ্ধ জনমত সংগঠিত করার উদ্যোগও চলেছিল। কাশিমবাজার রাজপরিবারের মহারানি স্বর্ণময়ীর‌ অবশ্য এই আন্দোলনে সহযোগিতার কথা শোনা যায়। মদনমোহন নিজে মুর্শিদাবাদে বিধবাবিবাহের পক্ষে আইন পাশ করানোর জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহে নেমেছিলেন। তার পরে এ জেলা থেকেই ১৮৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার, সার্কেল পণ্ডিত সুরেশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্বে গৃহীত স্বাক্ষরপত্র কলকাতায় পৌঁছয়। বিধবা বিবাহ আইন প্রবর্তনের পক্ষে ভারত সরকারের কাছে মুর্শিদাবাদ থেকে প্রেরিত শতাধিক গণ-আবেদনপত্রে প্রথম স্বাক্ষরটি করেন পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার।

সমাজ সংস্কারক, দয়ার সাগর... নানা অভিধায় বাঙালি আগলে রাখে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে। কিন্তু সব স্তরেই অপমানিত হতে হয়েছে তাঁকে। তেমনই কিছু টুকরো চিত্র সন্ধানের চেষ্টায় অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

—অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

(১)


মা-ছেলেতে বেশ বাদানুবাদ চলছে। ছেলে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি বিলেত গিয়ে আইন পড়ে ব্যারিস্টার হতে চান। তাই গোপনে মায়ের অনুমতি নিয়ে রওনা হওয়ার পরিকল্পনা করলেন তিনি। গোপনীয়তার কারণ, দাদামশাইকে বললে যদি অনুমতি না মেলে! কিন্তু মা হেমলতাদেবী জানালেন, তিনি তাঁর বাবাকে একটি বার বিষয়টি বলবেন।

দাদামশাইয়ের কাছে গোপন থাকল না কিছুই। সব জেনে নাতিকে বললেন, ‘টাকাপয়সার বড় অনটন হয়ে পড়েছে, এ-অবস্থায় আর হয় না।’ সুরেশচন্দ্রের মুখ ভার। কয়েক দিন পরে বাড়িতেই মাকে বললেন, ‘আমার বাবা থাকলে কি আর তোমার বাবার কাছে আবদার করতে যেতাম?’ কথাটা কানে যেতেই দু’চোখে বান ডাকল দাদামশায়ের। নাতিকে বললেন, ‘তোরা আমাকে পর ভাবিস…’
চিরকালের ‘কমন ম্যান’
বিদ্যাসাগর আরও কিছু, আরও মহৎ কোনও শক্তিপুঞ্জ যিনি সাধারণ্যে ‘কমন ম্যান’দের মধ্যে থেকে, নিজ পুরুষকারের জোরে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করেছেন।

—অশোককুমার মুখোপাধ্যায়



বিদ্যাসাগর মানে কি শুধু বর্ণপরিচয়--প্রথম ভাগ দ্বিতীয় ভাগ, বেতাল পঞ্চবিংশতি-সহ তাঁর যাবতীয় শিশুভোগ্য স্কুলপাঠ্য বই? ভাষা আর শিক্ষা-সংস্কার? স্কুল-কলেজ স্থাপনা? অথবা বিদ্যাসাগর মানে কি শুধুই প্রবহমানতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে শাস্ত্রের যুক্তি শানিয়ে বিধবা-বিবাহের প্রচলন? যদিও তিনি লিখেছেন, ‘বিধবাবিবাহ-প্রবর্তন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম’, তবুও বিদ্যাসাগরকে মনে রাখা কি শুধুই এক সমাজ-সংস্কারক হিসাবে?

বিদ্যাসাগরের কাছে ধর্ম কোনও তত্ত্ব বা তর্ক নয়, ধর্ম মানে কাজ
আমাদের মনে এ প্রশ্ন জাগবেই। ধর্ম-সমাজের বিপক্ষেই তো তাঁর কথা বলার কথা ছিল। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কদাচার ও অত্যাচার প্রবিষ্ট বলে কিছু দিন পরই যিনি নিজের প্রাণটিকে পর্যন্ত পণ করে লড়াইয়ে নামবেন, তাঁর কি মনে হয়নি, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারে নিজেকে একটু হলেও জড়াতে? অন্তত নিজে কী ভাবছেন, তা স্পষ্ট করে বলতে— যাকে আজ আমরা বলি, একটা ‘অবস্থান’— নিতে?

—সেমন্তী ঘোষ



বাবার হাত ধরে যখন ঈশ্বরচন্দ্র কলকাতায় এসে পড়াশোনা শুরু করলেন, সে এক অদ্ভুত সময়। ১৮২৯ সাল। রামমোহন রায়ের ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা রদ আইন পাশ হচ্ছে সেই বছর। নয় বছরের বালক ঈশ্বরের কানে বিষয়টা ভেসে এসেছিল কি?
শিক্ষা সংস্কার করে আধুনিক যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে নিজেকে উজাড় করে দেন ঈশ্বরচন্দ্র। বিদ্যাসাগরের জন্ম দ্বিশতবর্ষ লিখছেন কাকলি ভৌমিক

—কাকলি ভৌমিক



ভারতীয় দর্শনের মধ্যে চার্বাক দর্শনই হল স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী ধারা। ভারতীয় দর্শন মূলত অধ্যাত্মবাদের দর্শন, তাই এই প্রকার দর্শনের প্রচলিত বা সর্বজনবিদিত দিকটি চার্বাকবাদীরা অনুসরণ করেননি। চার্বাক দর্শন নাস্তিক ও জড়বাদী। ভারতীয় দর্শনিকদের ধারণা অনুযায়ী মোক্ষ লাভের জন্য যে জ্ঞানচর্চা, সেটিই আসল দর্শন। চার্বাক মত এই মোক্ষলাভকেই সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন জগতের অন্তিম উপাদান হল জড় এবং জড় থেকেই এই জগতের উৎপত্তি। অজড় বলে এ জগতে কিছু নেই। দেহাতিরিক্ত আত্মাও নেই, পাপ-পুণ্য কিছুই নেই, তাই কর্মফল, মুক্তি এ সব কিছুই নেই।
ব্যক্তি-বিদ্যাসাগর খুব একটা রম্য অনুভূতি গড়ে তুলতে পারেননি বালক রবীন্দ্রনাথের মনে। কিন্তু সীতার বনবাস, শকুন্তলা, বেতাল পঞ্চবিংশতি, বোধোদয়— এইসব বইয়ের মধ্য দিয়ে যে বিদ্যাসাগরকে সেই বালক কালে পাশে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তার অনুরণন ছিল আজীবন।

—প্রবীর সরকার



তখন চলছিল ‘ঘরের পড়া’। বালক রবীন্দ্রনাথের জীবনে সেটা ছিল গড়ে ওঠার কাল। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে শিক্ষকেরা আসতেন নিয়ম করে এবং তার ব্যতিক্রম হত না বলে দুঃখ হত খুব। বৃষ্টির দিনেও দেখা যেত সমস্ত প্রত্যাশা ভঙ্গ করে “দৈবদুর্যোগে-অপরাহত সেই কালো ছাতাটি দেখা দিয়াছে।” এঁদেরই একজন রামসর্বস্ব পণ্ডিত যিনি একই সঙ্গে ছিলেন ‘ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমী’ তথা মেট্রোপলিটান স্কুলের শিক্ষক এবং রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃত ভাষার গৃহশিক্ষক। তাঁর উৎসাহে তাঁরই সঙ্গে “ম্যাকবেথের” অনুবাদ শোনাতে বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়েছিলেন বালক রবীন্দ্রনাথ, যার উল্লেখ রয়েছে ‘জীবনস্মৃতি’তে। এই স্কুলের সভাপতি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাই সেকালে লোকের মুখে এটি বিদ্যাসাগরের স্কুল নামেই পরিচিত ছিল।
vidyasagar.info ©