মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

His reformist campaign though had to face opposition from Hindu orthodoxy. The chief antagonist, of course, was the conservative Raja Radhakanta Deb who had also sparred with Ram Mohan Roy over Sati. Vidyasagar had to face opposition on the streets of Calcutta and amongst the Bengali bhadralok. The backlash also came in the form of a counter-petition with 30,000 signatories. However, the Widows’ Remarriage Act was passed successfully in 1856.

—SANJEET KASHYAP



Ishwar Chandra Vidyasagar’s many roles as an educationist, writer, social reformer, and feminist have rightly earned him the credential of being one of the early progenitors of Indian modernity. Underlying all these credentials of Vidyasagar, however, was his own brand of liberal humanism. While the modernising metropolitan West is considered to be the fertile ground for liberal humanism and indeed the colonizing mission brought these newfound influences to the periphery of Indian society, Vidyasagar essentially embodied practical humanism.

The practical humanism of Vidyasagar was shaped by both his readings and lived experience. Born a poor Brahmin, his deprived childhood was made bearable by the generosity of kind strangers. Vidyasagar fondly recalls one particular widow Raimoni in his memoirs who treated him as her own son. Besides, despite his training as a Sanskritist, he was also exposed to the western Enlightenment ideas of secularism, agnosticism, rationalism, and liberty. These two distinct experiences determined the career trajectory of Vidyasagar.
উনি উচ্চ শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষার বুনিয়াদ স্থাপন করেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। উনি দেখলেন, স্ত্রী শিক্ষার অভাবে শিশুদের প্রকৃত শিক্ষা হওয়া সম্ভব নয়। উনি মনুস্মৃতি খুঁজে এক শ্লোক বার করেন যাতে বলা হয়েছে, স্ত্রীলোকদের শিক্ষা দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তাই স্ত্রীলোকদের শিক্ষার উপযোগী করে তিনি পুস্তক রচনা করেন এবং বীটন (বেথুন) সাহেবের সহযোগিতায় মেয়েদের শিক্ষার জন্য বেথুন কলেজ স্থাপন করেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার চেয়ে ছাত্রী যোগাড় করা অনেক কঠিন কাজ। উনি স্বয়ং সাধু-জীবন যাপন করতেন এবং মহান বিদ্বান ছিলেন, সে-কারণে তাঁকে সমস্ত লোক সম্মান করতেন, তাই উনি যখন সম্মানিত ব্যক্তিদের কাছে তাঁদের মেয়েদের কলেজে পাঠানোর কথা বললেন তাতে সকলেই সাড়া দিলেন। সম্মানিত ঘরের মেয়েরা কলেজে যেতে আরম্ভ করল।

—মহাত্মা গান্ধী



বাংলাদেশে বিলাতী মাল বর্জনের জন্য যে জোর আন্দোলন চলছে, এটা সাধারণ ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যথেষ্ট শিক্ষা বিস্তার হয়েছে এবং বাঙালীরা বেশ বুদ্ধিমান জাতি। সেইজন্য ওখানে এমন আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। স্যার হেনরি কটন বলেছেন, বাংলা কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত শাসনকার্য চালায়। এর কারণ জানার প্রয়োজন আছে।

এটা নিশ্চিত যে, প্রত্যেক জাতির উন্নতি বা অবনতি তার বিশিষ্ট জনকের উপর নির্ভর করে। যে জাতির মধ্যে ভালো ভালো লোক জন্মায়, তার উপর ঐসব লোকদের প্রভাব না পড়ে যায় না। বাঙালীদের কিছু বিশেষত্ব আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। এর কিছু কারণ আছে, যার মধ্যে মুখ্য কারণ হ’ল যে, গত শতাব্দীতে বাংলাদেশে বহু মহাপুরুষ জন্মেছেন। রামমোহন রায়ের পর ওখানে একের পর এক মহাপুরুষের আগমন হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। তাঁর সংস্কৃত ভাষায় জ্ঞান এত বেশী ছিল যে, কলকাতার বিদ্বৎ সমাজ তাঁকে বিদ্যাসাগর উপাধি দেন। তবে ঈশ্বরচন্দ্র শুধু বিদ্যাসাগরই ছিলেন না, তিনি দয়া, উদারতা ও অন্য অনেক সদগুণেরও সাগর ছিলেন। উনি হিন্দু, তার ওপর ব্রাহ্মণও ছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে যিনি ভালো ব্রাহ্মণে-শূদ্রে, হিন্দু-মুসলমানে কোনো ভেদ ছিল না। যিনি ভালো কাজ করেন তিনি উচ্চ-নীচে প্রভেদ করেন না। তাঁর গুরুর ওলাউঠা রোগ হয়েছিল, তিনি তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করেছিলেন। নিজে খরচা করে ডাক্তার আনিয়েছিলেন, নিজের হাতে মলমূত্র পরিষ্কার করেছিলেন।
বিদ্যাসাগর তৎকালীন বর্ধমানের রাজসভায় যাতায়াত করতেন। আসতেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও। সেই সম্পর্কের সূত্রে বিদ্যাসাগর তৎকালীন বর্ধমানাধিপতি মহতাবচাঁদ (১৮৩২-১৮৭৯)-কে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘বঙ্গের প্রথম মানুষ’ বলে। মহতাবচাঁদও বিধবাবিবাহ আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বহুবিবাহ রোধে তৎকালীন সরকারের কাছে একটি আবেদনপত্র পাঠান। তাঁর দানধ্যান, শিক্ষার প্রসার উদ্যোগ, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়ও কিছুটা হলেও বিদ্যাসাগরের প্রভাব ছিল। যখন, বিদ্যাসাগর বাংলা লিপি নিয়ে ভাবছেন তখন মহতাবচন্দ্র, ‘মহতাব-লিপি’ প্রচলন করেছিলেন।

—শ্যামলচন্দ্র দাস



বিদ্যাসাগরের জন্মের দু’শো বছর হতে চলল। নতুন অধ্যাপক পদ থেকে শুরু করে খণ্ডে খণ্ডে তাঁর রচনাবলী প্রকাশ— এর মধ্যেই নানা উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তাঁর এই প্রেক্ষিতে বহুমুখী প্রতিভাধর বিদ্যাসাগর কী ভাবে তৎকালীন বর্ধমানেরও পরমাত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন তা ফিরে দেখা যায়।

বর্ধমানে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে দুর্ভিক্ষ হয়। এখানেই দুর্ভোগের শেষ নয়, তিন বছর পরেই ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমান ও হুগলিতে ম্যালেরিয়া মহামারির আকার নেয়। বহু গ্রাম ও শহর জনশূন্য হতে থাকে। এই সময় বিদ্যাসাগর ত্রাণশিবির ও চিকিৎসা-সত্র খোলেন বর্ধমানের কমলসায়র (এখন বর্ধমান শহরের নবাবহাটের কাছে) এলাকায়। কিছু দিন তিনি সেখানকার বাগানবাড়িতেও ছিলেন। বিদ্যাসাগর বর্ধমান শহর সংলগ্ন একাধিক বস্তি, আশপাশের এলাকা ঘুরে ঘুরে আক্রান্তদের সেবা করেছিলেন। এ ব্যাপারে মহারাজ মহতাবচাঁদ ও চিকিৎসক গঙ্গানারায়ণ মিত্র নানা ভাবে সাহায্য করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন ইংরেজ সরকারের কাছে ওষুধপত্র ও ডাক্তারের জন্য বিদ্যাসাগর আবেদন জানালে তার ব্যবস্থাও হয়। তাঁর তৃতীয় ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন লিখেছেন, ‘এই সায়রের চারদিকে ছিল দরিদ্র নিরুপায় মুসলমানগণের বাস। এই পল্লীর বালকবালিকাগণকে প্রতিদিন প্রাতে জলখাবার দিতেন। যাহাদের পরিধেয় বস্ত্র জীর্ণ ও ছিন্ন দেখিতেন, তাহাদিগকে অর্থ ও বস্ত্র দিয়া কষ্ট নিবারণ করিতেন। এতদ্ভিন্ন কয়েক ব্যক্তিকে দোকান করিবার জন্য মূলধন দিয়াছিলেন।…ঐ সময়ে অগ্রজ মহাশয় কমলসায়রের সন্নিহিত একটী মুসলমান কন্যার বিবাহের সমস্ত খরচ প্রদান করিয়াছিলেন’ (বিদ্যাসাগর-জীবনচরিত)। সেই সময়ের ‘সঞ্জীবনী’ লিখেছিল, ‘বর্দ্ধমানে যখন বড় ম্যালেরিয়া জ্বরের ধুম, তখন আমরা কলিকাতাতে বসিয়া শুনিলাম যে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজ ব্যয়ে ডাক্তার ও ঔষধ লইয়া সেখানে গিয়াছেন; এবং হাড়ি, শুড়ি, জেলে, মালো, জাতি বর্ণ নির্বিশেষে সকলের দ্বারে দ্বারে ফিরিয়া চিকিৎসা করাইতেছেন। তিনি গাড়িতে বসিয়াছেন, একটী মুসলমানের বালক হয়ত তাঁহার ক্রোড়ে রহিয়াছে।’ জাতিভেদ আক্রান্ত সমাজে এমন উদারতা তখন বিরল।
মানচিত্র অনুযায়ী এটা স্পষ্ট যে, রাজকৃষ্ণবাবুর যে বাড়িতে (১২ নং সুকিয়া স্ট্রিট) প্রথম বিধবাবিবাহটি হয়েছিল তা কোনও মতেই আজকের ৪৮ নং কৈলাস বোস স্ট্রিট নয়। কারণ ১৮৫৯-র ‘ডিরেক্টরি’-তে ‘১২’-র যা অবস্থান, উনিশ শতকের প্রায় শেষ দিকের মানচিত্রে তার অবস্থানে বিশেষ বদল ঘটেনি। এটা বলা হচ্ছে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায় স্ট্রিট ও মদন মিত্র লেনের অবস্থানসাপেক্ষে। আজও মদন মিত্র লেনের মুখোমুখি ঠায় দাঁড়িয়ে ৩২ কৈলাস বোস স্ট্রিট, সে দিনের ১২ নং সুকিয়া স্ট্রিটের ‘premises’। ‘১২’ বদলে গিয়ে ‘২৩’ (পরবর্তী কালের ৪৮ কৈলাস বোস স্ট্রিট) হয়নি কারণ দু’য়ের মাঝে আজ প্রায় ছ’খানা বাড়ির দূরত্ব। সুতরাং এই ‘৪৮’ রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় আশ্রয় বলেই ধরা যেতে পারে, প্রথম ভদ্রাসন এখানে ছিল বলে মনে হয় না। যাই হোক অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত ও এই বিধবাবিবাহের প্রথম বাড়ি-সংক্রান্ত ধারণার পুনর্বিবেচনা তাই প্রয়োজন।

—শেখর ভৌমিক


নগরেতে হইয়াছে গেল গেল রব।
পলাইয়া ক্ষেত্রে যায় নরনারী সব॥
…কাহারো পলায়ে গেল বিধবা বহুড়ী।
এর বাড়ি তার বাড়ি খুঁজিছে শাশুড়ু॥


বিধবাদের জগন্নাথধাম ‘পালানো’ সম্পর্কে এই বর্ণনা পাওয়া যায় ১৮৪৯ সালের ‘সম্বাদ রসরাজ’ পত্রিকায়। উনিশ শতকে এমন পলায়ন সংবাদ রাশি রাশি। অষ্টাদশ শতকেই তো বিজয়রাম সেন বঙ্গবিধবাদের কাশীবাসের কথা লিখে গিয়েছেন, “কাশীর মধ্যেতে আছেন বিধবা জতেক/ সবাকারে দিলা কর্তা [জয়নারায়ণ ঘোষাল] তঙ্কা এক এক।” মনে হয়, দশাশ্বমেধ ঘাটে দাঁড়ানো ‘ঘৃষ্টগাত্রী বাঙালি তরুণী বিধবার দল’ কি এঁদেরই উত্তরসূরি? যাঁদের দেখে ‘মহাস্থবির জাতক’-এ প্রেমাঙ্কুর আতর্থী নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সংসারের সব বাধা ছিন্ন করে রোজ সকালে তাঁরা কাকে প্রণাম করেন। লেখক নিজেই উত্তর দিয়েছেন, তাঁরা এখানে আসেন ‘মরবে’ বলে, কারণ এখানে মরলে আর জন্মাতে হয় না। আসলে বালবৈধব্য যন্ত্রণা, মদনদেবতার শর সইতে না পেরে অনেক সময় ‘গর্ভ’ হয়ে পড়া এবং তা ‘নষ্ট’ করতে গিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ হওয়া (যেমনটা হয়েছিল চন্দ্রা নামের সেই মেয়ের, যাঁর কাহিনি অনেককাল আগে তুলে ধরেছিলেন রণজিৎ গুহ)— এ তো ছিল সে কালের নিত্যকার ঘটনা। বঙ্গবিধবা এগুলোকে অবশ্য ভাগ্য বলেই মেনে নিয়েছিলেন। তবে এক-আধটু আওয়াজ যে মাঝেমধ্যে ওঠেনি এমন নয়। নিজের শিশুকন্যার বালবৈধব্য ঘোচাতে রাজা রাজবল্লভ অনেক কাল আগে বিধবাবিবাহ প্রচলনে উদ্যোগী হয়েছিলেন, কিন্তু নবদ্বীপের পণ্ডিতসমাজের বিরোধিতায় তা বানচাল হয়ে যায়। ডিরোজিয়োপন্থীদের উদ্যোগের কথা ‘বেঙ্গল স্পেকটেটর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪২-এ। তার পর প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ সার্থক রূপ পেল বীরসিংহের ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্রটির মাধ্যমে— বাংলাদেশে যিনি করুণাসাগর বিদ্যাসাগর নামেই বেশি পরিচিত।
হেন ঈশ্বরচন্দ্রের ব্যক্তিজীবন যে খুব একটা সুখের ছিল এমন নয়! বিধবা বিবাহ নিয়ে লড়ছিলেন বটে কিন্তু ভেতরটা ক্রমশ ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল! সময়টা ১৮৬৯। ক্ষীরপাই গ্রামের মুচীরাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একদা বিধবা মনমোহিনীর বিয়ে। সব ঠিকঠাক। খবর পেয়েই গ্রামে ছুটে এলেন ঈশ্বরচন্দ্র। তাঁর আনন্দ আর দেখে কে! কিন্তু হালদারেরা দলবেঁধে দেখা করলেন ঈশ্বরচন্দ্রের সঙ্গে। অনুরোধ,যাতে বিয়ে না হয়। ঈশ্বরচন্দ্র মেনে নিলেন। বিয়ে হবে না! বিদ্যাসাগর বাধ্য হয়ে মনমোহিনী ও তাঁর মা’কে নিজেদের বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। এ যন্ত্রণা তিনি আজীবন ভুলতে পারেননি!

—অময় দেব রায়



ঠাকুরদাস বাড়িতে নেই। রামজয় ছুটলেন। খবরটা যে এখনই দিতে হয়। পথেই ছেলের সঙ্গে দেখা। “একটি এঁড়ে বাছুর হইয়াছে।’’ ঠাকুরদাস জানতেন গোয়ালে একটি গাভী গর্ভবতী। এ তো বেশ ভাল খবর। ঘরে পৌঁছেই সোজা ছুটলেন গোয়ালে। ছেলের কাণ্ড দেখে রামজয় তর্কভূষণের হাসি আর দেখে কে! “ও দিকে নয়, এ দিকে এস, আমি তোমায় এঁড়ে বাছুর দেখাইয়া দিতেছি।” নিয়ে গেলেন আঁতুড়ঘরে। একটি ফুটফুটে সদ্যোজাত সন্তান। পিতৃত্বের অহঙ্কারে হাসি ফুটল বাবার মু্খেও। বাবার পুরো নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেলের নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

ছোটবেলায় ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন ভয়ানক দুরন্ত। মারধর, বকাবকি, কিছুতেই তাঁকে থামানো যেত না। ঠাকুরদাস তখন আত্মীয়-পরিজনদের জড়ো করে বাবার গল্পটি শোনাতেন। “ইনি হলেন সেই এঁড়ে বাছুর, বাবা পরিহাস করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু, তিনি সাক্ষাৎ ঋষি ছিলেন, তাঁহার পরিহাস বাক্যও বিফল হইবার নহে, বাবাজি আমার, ক্রমে, এঁড়ে গরু অপেক্ষাও একগুঁইয়া হইয়া উঠিতেছেন।”
হিন্দু কলেজের ভিতরেও ছাত্ররা মারদাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ত প্রায়ই। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন তাঁর স্মৃতিচারণায় আছে এমন এক ঘটনা। হিন্দু স্কুল তখন শ্যাম মল্লিকদের জোড়াসাঁকোর থামওয়ালা বাড়িতে কিছু দিনের জন্য স্থানান্তরিত হয়েছে। এক দিন টিফিনের ছুটিতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দেখলেন, স্কুলের গণ্ডির মধ্যেই একটা লোককে পুলিশের এক কনস্টেবল থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাটানি করছে। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ আর তাঁর বন্ধুরা পুলিশটিকে অনুরোধ করলেন তাকে ছেড়ে দিতে। কনস্টেবল সে কথা কানেই তুলছে না দেখে ইটের ঢিবি থেকে ইট তুলে ছুড়ে মারতে শুরু করলেন পুলিশটিকে তাক করে। প্রাণ বাঁচানোর দায়ে কনস্টেবল লোকটিকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল।

—শুভাশিস চক্রবর্তী



দুই কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে রীতিমত পুলিশ ডাকতে হত। রক্তগঙ্গা বইত কোনও কোনও দিন, এতই তীব্র ছিল দু’টি কলেজের ছাত্রদের রেষারেষি। আজ থেকে কম—বেশি দেড়শো বছর আগে। যুযুধান দুই পক্ষের একটি সংস্কৃত কলেজ, অন্যটি হিন্দু কলেজ।

সংস্কৃত কলেজের ছাত্ররা ইট—পাটকেল জোগাড় করে রাখত তেতলার ছাদে। মারামারি শুরু হলে উপর থেকে ছুড়ে মারত। আটকে পড়ত শান্ত, গোবেচারা ছেলেরা। দু—পক্ষের সংঘর্ষ যত ক্ষণ চলত, তারা লুকিয়ে থাকত কলেজের কোনও ক্লাসঘরে। পুলিশ এলে লড়াই থামত, তারা সাহস পেত বাড়ি যেতে। ‘সমাচারচন্দ্রিকা’ পত্রিকার ১৮৬২—র ৩০ অগস্ট সংখ্যায় লেখা, ‘হিন্দু কালেজ ও সংস্কৃত কালেজের কতিপয় ছাত্র বিরোধী হইয়া পথিমধ্যে পরস্পর দাঙ্গা করিয়াছে।’ এই সংবাদেই জানা গেছে সংস্কৃত কলেজের ছেলেরা হেরে গেছে; হারের কারণ নাকি ‘হিন্দু কালেজের ছাত্রেরা তেজস্বী বিশেষতঃ ধনী ভাগ্যধর লোকের সন্তান।’
সতীদাহ প্রথা নিবারণের ফলে বহু অল্পবয়ষ্ক নারী বিধবা হয়। তাদের অসহায়ত্ব, নিরাপত্তাহীনতা এবং উঠতি বয়সের স্বাভাবিক শারীরিক চাহিদার কারণে পরবর্তীকালে কেউ কেউ পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করে, অনেকে সংসারে বা বাড়ির বাইরে অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়। গুপ্ত ভ্রূণ হত্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রামমোহন রায়ের মতোই টের পেলেন অকাট্য যুক্তির জোরে নয়, শাস্ত্রীয় কুসংস্কার দিয়েই এদেশের মানুষের অন্ধ বিশ্বাস ও কর্মধারা পরিচালিত হয়। ফলে সতীদাহ নিবারণের জন্য রামমোহন যেমন শাস্ত্র থেকেই মাল-মসলা জোগাড় করে শাস্ত্রকেই ঘায়েল করেছিলেন, বিদ্যাসাগর-ও এক-ই পথ বেছে নিলেন। শাস্ত্র দিয়েই শাস্ত্রের সংস্কারকে প্রতিহত করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মনোসংযোগ করেন বিভিন্ন ধরনের শাস্ত্র অধ্যয়ন করার জন্য। সহমরণের বদলে ব্রহ্মাচার্য্য পালনের মধ্য দিয়ে বিধবা নারী যে জীবন ধারণ করে, বিদ্যাসাগর তাকে স্বাভাবিক জীবনের পরিবর্তে মৃতসম জীবন বলে অবহিত করেন। অথচ তিনি নারীকে দিতে চেয়েছিলেন একটি পরিপূর্ণ, উপভোগ্য জীবন। নারীর শরীরকে তিনি নারীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে নিজেকে পরিতৃপ্ত রাখার অধিকার নারীকেই দিতে চেয়েছিলেন বিধবা বিবাহের মাধ্যমে। সেই হিসেবে বিদ্যাসাগর প্রকৃত-ই প্রগতিশীল ও আধুনিক দৃষ্টিসম্পন্ন একজন নারীবান্ধব মানুষ বলে নিজেকে প্রমাণ করেন।

—পূরবী বসু



ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ অর্ধাংশে এই উপমহাদেশ আলোকিত করে নারী পুরুষ নির্বিশেষে আবির্ভূত হয়েছিলেন বেশ কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ। বাংলার সেই রেনেসাঁসের যুগে— রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ সংস্কার, নারী প্রগতিসহ সকল উন্নয়নমূলক কাজে এই সাহসী, প্রখঢ় বুদ্ধিসম্পন্ন ও মৌলিক চিন্তার মানুষরা মাত্র একশ বছরে এই ভূখণ্ডকে মিলিতভাবে যতখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা আর অন্য কোনো শতাব্দীতে ঘটেছে বলে মনে হয় না। এই সময়টিতে কী ধরনের নারীবান্ধব নীতির সংযোজন ঘটেছিল বা সামাজিক সংস্কারে কী ধারার বৈপ্লবিক কাজ চলছিল, এবং এসব ব্যাপারে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, নারীরা কতখানি এগিয়ে যেতে পেরেছিল, কোন কোন মহল বা শক্তি তাদের সহযোগিতা করেছিল, কারা বাধা দিয়েছিল, তার আভাস পেতে পারি আমরা। পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত অথবা বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে তখন বিশ্লেষণ করা সহজতর হয়ে ওঠে।

আমরা জানি রাজা রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলার গৌরবোজ্জ্বল এক সময়। বলা চলে আঠারো শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের মধ্যেকার সময়টি— বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের, বিশেষ করে নারীর অবস্থার উন্নয়নের, এক স্বর্ণযুগ ছিল। একে বাংলার নবযুগও বলা চলে।
গত দুইশ বছরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে অসংখ্য আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তিনি নিজের কালে যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি তার বিরোধীপক্ষ সমালোচনার তিরে তাকে বিদ্ধ করতেও পিছপা হয়নি। বিরোধীপক্ষের লেখায় ও কথায় জর্জরিত হয়েছেন তিনি। নানাভাবে তাকে আঘাত করার চেষ্টা হয়েছে। তাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু তিনি পিছপা হননি নিজের দায়িত্ব থেকে। যা তিনি সমাজের ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক মনে করেছেন, তা বাস্তবায়নে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম পণ্ডিত নিযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে কর্মজীবন, তা শেষ হয় ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। এর পর আমৃত্যু (মৃত্যু ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট) তিনি সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি ব্যস্ত ছিলেন বই লেখা ও বই ছাপার কাজে। কথিত আছে যে, সিপাহী বিদ্রোহের সময় অধ্যক্ষের অনুমতি ছাড়া কলেজে সেনানিবাস স্থাপনের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন।

—মামুন রশীদ



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে জানেন না, তার সম্পর্কে শোনেননি— এমন বাঙালির সংখ্যা বিরল। ইতোমধ্যে আমরা জন্মের দ্বিশতবর্ষ পেরিয়ে এসেছি। অথচ দুইশ বছরেও তার কীর্তি ম্লান হয়নি। তাই স্বকালে যেমন তেমনি উত্তরকালেও বিদ্যাসাগর আলোচিত এবং আলোকিত।

যতো দিন যাচ্ছে, তিনি আরও স্বমহিমাণ্ডিত হয়ে উঠছেন। তার কীর্তিই তাকে আলোচনায় রেখেছে। সমাজে ও দেশের মানুষের মাঝে, অন্ধ-অজ্ঞ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে জাগিয়ে তুলতে যে আলো তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সে আলোতেই কেটেছে আঁধার। সে আলোর রেখা ধরেই এগিয়ে চলা।
বিধবাবিবাহ সংগঠিত করতে গিয়ে বারবার প্রতারিত হয়ে পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি লিখছেন, “আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।” এই পরম সুহৃদ দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও (স্যর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা) চলে গেলেন ১৮৭০ সালে।

—সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়



সাল ১৮৭৫, তারিখ ৩১ মে। স্থান কলকাতা। গভীর রাত।

অভিমানে ক্ষতবিক্ষত এক জন আমহার্স্ট স্ট্রিটের ৬৩ নম্বর বাড়িতে দোতলার একটি ঘরে বসে নিজের হাতে লিখছেন তাঁর ইচ্ছাপত্র বা উইল। তাঁকে শুধু তাঁর একমাত্র পুত্র বা পরিবার আহত করেনি, তাঁকে রক্তাক্ত করেছে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, ইংরেজ শাসক, সেই শাসকদের করুণা-লোভী জমিদার শ্রেণির বাবু সম্প্রদায়, এমনকী তাঁর পরম আরাধ্যা জননী। মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সেই উইল লিখছেন তিনি।

পঁচিশটি অনুচ্ছেদে সম্পূর্ণ এই উইল। এতে রয়েছে তাঁর নিজের সম্পত্তির তালিকা, পঁয়তাল্লিশ জন নরনারীকে নির্দিষ্ট হারে মাসিক বৃত্তি দেবার নির্দেশ। এর মধ্যে ছাব্বিশ জন তাঁর অনাত্মীয়। এ ছাড়াও ব্যবস্থা আছে দাতব্য চিকিৎসালয় ও মায়ের নামে স্থাপিত বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য। সব থেকে বিস্ময়কর পঁচিশ নম্বর অনুচ্ছেদ।
রামমোহন কিংবা বিদ্যাসাগরের কর্মক্ষেত্র হিন্দুসমাজেই নিবদ্ধ ছিল। এমন কি শিক্ষাবিস্তার ক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগর মুসলিম জনশিক্ষার দায়িত্ব নেন নি। কিন্তু এ জন্যে বিদ্যাসাগরকে দায়ী করা চলবে না। প্রথমত, এঁদের শিক্ষা-সমস্যা কিংবা সমাজ-সমস্যা নিবদ্ধ ছিল কোলকাতা ও তার চতুস্পার্শস্থ জেলাগুলোর উচ্চবর্ণের শিক্ষিত সমাজে। ইংরেজি শিক্ষাবিমুখ স্বসমাজের মানুষের সমস্যাও তাঁদের বিচলিত করে নি। দ্বিতীয়ত, সে যুগে বৈষয়িক বা আর্থনীতিক ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে মুসলমান সমাজের সঙ্গে উচ্চবর্ণের ও উচ্চ বিত্তের হিন্দুসমাজের মধ্যযুগীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনীতিক যোগসূত্র প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তৃতীয়ত, বিদ্যাসাগরের সমকালে নওয়াব আবদুল লতিফ প্রমুখের নেতৃত্বে মুসলিম-শিক্ষাপদ্ধতি সম্বন্ধে তখনো অস্থির বিচার বিবেচনা চলছে। আবদুল লতিফ স্বয়ং ছিলেন উর্দুভাষী এবং বিদেশাগত উচ্চবিত্তের উর্দুভাষী মুসলিম পরিবারগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। তাঁর বাঙলা-বিরোধী সুস্পষ্ট উক্তি রয়েছে। তিনি ছিলেন মুসলমানের মাতৃভাষারূপে উর্দু প্রর্বতনের দাবীদার এবং দেশজ নিম্নবিত্তের মুসলমানদের জন্যেও তিনি বিশুদ্ধ বাঙলা কামনা করেন নি— চেয়েছিলেন নিদেনপক্ষে সন্ধিকালের জন্যে সাময়িকভাবে আরবি-ফারসি-মিশ্রিত দোভাষী রীতির বাঙলার প্রচলন, যাতে উত্তরকালে মাতৃভাষারূপে উর্দু গ্রহণ করা সহজ হয়। এমন অবস্থায় বিদ্যাসাগরের পক্ষে মুসলমানের জন্যেও বাঙলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাপ্রয়াস সম্ভব ছিল না, তাঁর সে অধিকারই ছিল না।

—আহমদ শরীফ



বিদ্যাসাগরকে দেখিনি। শুনে শুনেই তাঁকে জেনেছি। ভালই হয়েছে। দেখলে তাঁকে খণ্ড খণ্ড ভাবেই পেতাম। শুনে শুনে তাঁকে অখণ্ডভাবে সমগ্ররূপে পেয়েছি। কেননা; চোখের দেখা হারিয়ে যায়। অনুধ্যানে পাওয়াই চিরপ্রাপ্তি, সেই পাওয়া যেমন অনন্য, তার স্থিতি যেমন মর্মমূলে, তেমনি তার রূপও সামগ্রিক।

উনিশ শতকী বাঙলায় অনেক কৃতীপুরুষ জন্মেছিলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের দান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সব কিছুর মূলে ছিলেন দুই অসামান্য পুরুষ। প্রথমে রামমোহন, পরে ঈশ্বরচন্দ্র। একজন রাজা, অপরজন সাগর। উভয়েই ছিলেন বিদ্রোহী। পিতৃ-ধর্ম ও পিতৃ-সমাজ অবজ্ঞাত ও উপেক্ষিত হয়েছে উভয়ের কাছেই। তাঁদের দ্রোহ ছিল পিতৃকূলের ধর্ম ও সমাজের, জাতি ও নীতির, আচার ও আচরণের বিরুদ্ধে।

উভয়েই ছিলেন পাশ্চাত্য প্রজ্ঞায় প্রবুব্ধ। জগৎ ও জীবনকে তাঁরা সাদা চোখে দেখবার, জানবার ও বুঝবার প্রয়াসী ছিলেন। বিষয়ীর বুদ্ধি ছিল তাঁদের পুঁজি। সমকালীন জনারণ্যে তাঁরা ছিলেন individual, ব্যক্তিত্বই তাঁদের চরিত্র। তাই তাঁরা ছিলেন চির-একা। তাঁদের কেউ সহযাত্রী ছিল না— বন্ধু ছিল না, সহযোগী ছিল না। তাই তাঁরা কেউ সেনাপতি নন, সংগ্রামী সৈনিক। অদম্য আকাঙ্ক্ষা আর দুঃসাহসই তাঁদের সম্বল। নতুন করে গড়ব স্বদেশ— এ ছিল আকাঙ্ক্ষা, আর একাই কাজে নেমে পড়ার দুঃসাহস। ভিমরুলের চাকে খোঁচা দেয়ার পরিণাম জেনেও হাত বাড়িয়ে দেবার সংকল্পই হচ্ছে তাঁদের ব্যক্তিত্ব। এ ব্যক্তিত্ব আত্মপ্রত্যয় ও মানব-প্রীতির সন্তান। রামমোহন ও বিদ্যাসাগরই আমাদের দেশে আধুনিক মানববাদের নকীব ও প্রবর্তক।
vidyasagar.info ©