“তাহার জীবনে প্রথম হইতে ইহাই দেখা যায় যে, তাহার চরিত্র সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমাগতই যুদ্ধ করিয়া জয় লাভ করিয়াছে। তাহার মতো অবস্থাপন্ন ছাত্রের পক্ষে বিদ্যালাভ করা পরম দুঃসাধ্য, কিন্তু এই গ্রাম্য বালক শীর্ণ খর্ব দেহ এবং প্রকাণ্ড মাথা লইয়া আশ্চর্য অল্পকালের মধ্যে বিদ্যাসাগর উপাধিপ্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহার মতো দরিদ্রাবস্থার লোকের পক্ষে দান করা, দয়া করা বড় কঠিন; কিন্তু তিনি যখন যে অবস্থাতেই পড়িয়াছেন নিজের কোনো প্রকার অসচ্ছলতায় তাহাকে পরের উপকার হইতে বিরত করিতে পারে নাই, এবং অনেক মহিশ্চার্যশালী রাজা রায় বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান সেই ‘দয়ার সাগর’ নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া রহিলেন।”
—রাজীব সরকার
বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশায় ও পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। উনিশ শতকীয় নবজাগরণের অন্য কোনো মনীষীকে নিয়ে এত চর্চা হয়নি। যে কয়জন লেখক অসাধারণ নৈপুণ্যে বিদ্যাসাগরকে উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে থাকবে রবীন্দ্রনাথের নাম।
একটি চতুর্দশপদী কবিতা, চারটি প্রবন্ধ এবং বিদ্যাসাগর কলেজ পত্রিকায় বিদ্যাসাগর স্মরণে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মণিমুক্তা খচিত এ শ্রদ্ধার্ঘ্য সম্পর্কে আলোচনার আগে ফিরে যেতে হয় রবীন্দ্রনাথের শৈশবে। মাটির প্রতিমায় চক্ষুদান করেন পুরোহিত। বঙ্গ প্রতিমায় ‘চক্ষুদান’ করেছিল বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’। এই মহামূল্যবান বইয়ের সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছিল- “কেবল মনে পড়ে, জল পড়ে পাতা নড়ে তখন ‘কর’ ‘খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটাইয়া সবেমাত্র কূল পাইয়াছি। আমার জীবনের এইটেই আদি কবির প্রথম কবিতা।”
‘তিনি (রামসর্বস্ব পণ্ডিত) একদিন আমার ম্যাকবেথের তর্জমা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে শুনাইতে হইবে বলিয়া আমাকে তাহার কাছে লইয়া গেলেন। তখন তাহার কাছে রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বসিয়া ছিলেন। পুস্তকে ভরা তাহার ঘরের মধ্যে ঢুকিতে আমার বুক দুরুদুরু করিতেছিল; তাহার মুখচ্ছবি দেখিয়া যে আমার সাহসবৃদ্ধি হইল তাহা বলিতে পারি না। ইহার পূর্বে বিদ্যাসাগরের মতো শ্রোতা আমি তো পাই নাই; অতএব, এখান হইতে খ্যাতি পাইবার লোভটা মনের মধ্যে খুব প্রবল ছিল। বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম।’
