মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

পণ্ডিতপ্রবর
শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

শুনেছি লোকের মুখে পীড়িত আপনি
হে ঈশ্বরচন্দ্র!  বঙ্গে বিধাতার বরে
বিদ্যার সাগর তুমি; তব সব মণি,
মলিনতা কেন কহ ঢাকে তার করে?
বিধির কি বিধি সুরি, বুঝিতে না পারি,
হেন ফুলে কীট কেন পশিবারে পারে?
করমনাশার স্রোত অপবিত্র বারি
ঢালি জাহ্নবীর গুণ কি হেতু নিবারে?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশালত্ব আকাশচুম্বী। বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-মনন-পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন অনন্যসাধারণ। বিদ্যা-শিক্ষা প্রসারে তার ভূমিকা প্রবাদতুল্য। সেই সময়কার পশ্চাৎপদ হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন করে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত করেছিলেন। বহুক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় বাঙালি জাতি তাকে চিরদিন স্মরণে রাখবে। তার অমরত্ব লুপ্ত হওয়ার নয়।

—মযহারুল ইসলাম বাবলা



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশালত্ব আকাশচুম্বী। বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-মনন-পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন অনন্যসাধারণ। বিদ্যা-শিক্ষা প্রসারে তার ভূমিকা প্রবাদতুল্য। সেই সময়কার পশ্চাৎপদ হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন করে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত করেছিলেন। বহুক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় বাঙালি জাতি তাকে চিরদিন স্মরণে রাখবে। তার অমরত্ব লুপ্ত হওয়ার নয়।

বিদ্যাসাগর প্রকৃত অর্থেই ইহজাগতিক মানুষ ছিলেন। দেবদেবী কিংবা দেবদূত ছিলেন না। ওতে তার বিশ্বাসও ছিল না। আর অনিবার্যরূপে তিনি ছিলেন বাঙালি। তার মহান কীর্তির পাশাপাশি বিশেষ ক্ষেত্রে সীমারেখাও ছিল। যে সীমা বা পরিসর তিনি অতিক্রম করতে পারেননি। রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন, তাই ত্রুটি-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। একটি বিশেষ পরিসরের বৃত্তে আজীবন আবদ্ধ থেকেছেন। বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা করেননি।

তার নাম ঈশ্বরচন্দ্র ছিল বটে, কিন্তু তিনি ঈশ্বরকেন্দ্রিক ছিলেন না। ছিলেন মানবকেন্দ্রিক। এর বহু প্রমাণ রয়েছে তার জীবনজুড়ে। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদে থাকাকালে ওই কলেজে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ শিক্ষার্থী ছাড়া অন্যদের প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সংস্কৃত কলেজে যাতে কায়স্থ শিক্ষার্থীদের অন্তত পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়— ঈশ্বরচন্দ্র সেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এতে কলেজের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা চরম বিরোধিতা করেন। এ দলে তার ব্রাহ্মণ শিক্ষকরাও ছিলেন।
একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং প্রতিকূল ঔপনিবেশিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থান করে বিদ্যাসাগর কীভাবে মনুষ্যত্বের চূড়ায় আরোহণ করতে পেরেছিলেন, তা আজকের বাঙালির কাছে বিস্ময় উদ্রেককারী বিষয়…

—খোন্দকার সিরাজুল হক



‘বিদ্যাসাগর’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ—‘সাগরের মতো ব্যাপক ও গভীর বিদ্যা যাঁর’। কিন্তু সমগ্র বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর বলতে একজনকেই বোঝায়, যাঁর পিতৃদত্ত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এভাবেই আমরা পেয়েছি ‘বিশ্বকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘নেতাজী’, ‘দেশবন্ধু’, ‘শেরে বাংলা’, ‘বঙ্গবন্ধু’ প্রভৃতি উপাধির অনন্যসাধারণ ব্যক্তিবর্গকে, যাঁরা তাঁদের অসামান্য অবদানের জন্য পরিবারের গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র জাতির পথপ্রদর্শকরূপে বিবেচিত হয়েছেন। এ কারণেই দেশবাসী এই প্রিয় মানুষদের বিশেষভাবে সম্বোধন করে আনন্দ পেয়েছে। পরিতৃপ্ত হয়েছে। বিদ্যাসাগর বাঙালি সমাজের এমনই একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ, যিনি শিক্ষা বিস্তারে, সমাজ সংস্কারে ও সাহিত্য সাধনায় তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এবং মৃত্যু ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতায়। আজ তাঁর ১২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। আর কয়েক বছর পরেই ২০২০ সালে বাঙালি জাতি এই প্রতিভাধর মানুষটির দ্বিশত জন্মবার্ষিকী পালন করবে।
ভালো পাঠ্যবই মানসম্পন্ন শিক্ষার অন্যতম শর্ত। কিন্তু যোগ্য পাঠ্যবইয়ের বড়ো অভাব ছিল সেকালে। এই অভাব পূরণে বিদ্যাসাগর ও তার বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কার এগিয়ে আসেন। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ ও মদনমোহনের ‘শিশুশিক্ষা’ ছিল সম্প্রদায়নির্বিশেষ বাঙালির সূচনা-শিক্ষার হাতেখড়ির পুস্তিকা। আজও এর আবেদন নিঃশোষিত নয়। এর পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’, ‘ঋজুপাঠ’, ‘কথামালা’, ‘আখ্যানমঞ্জরী’র কথা কে ভুলতে চাইবেন! প্রাইমার-রচনার যে ধারা বিদ্যাসাগর প্রবর্তন করেছিলেন, তা-ই বাঙালির কাছে আদর্শ হয়ে উঠেছিল।

—আবুল আহসান চৌধুরী



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১) উনিশ শতকের এক কীর্তিমান বাঙালি। সমাজসংস্কার, শিক্ষাপ্রসার, নারীর আলোকিত ভুবন-নির্মাণ, বাঙলা গদ্যের বিন্যাস ও পরিচর্যা, অমিতবীর্য পৌরুষ, গভীর মানবিক মূল্যবোধ, ‘দয়া’ ও ‘করুণা’র প্রকাশ, সেক্যুলার চেতনা— তাকে বাঙালি সমাজে স্বতন্ত্র পরিচয়ে চিহ্নিত করেছে।

উনিশ শতকের বাংলার জাগরণ বলতে যা বোঝায়, প্রকৃতপক্ষে তা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত বাঙালি জাগরণ। অন্য-অর্থে এ হলো বিত্ত ও বিদ্যার সমন্বয়ে নবচেতনায় প্রাণিত বাঙালি হিন্দুর সামাজিক উত্থান। এই যে নবজাগৃতি, কারণ বা ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, এর আলোকিত আঙিনায় বাঙালি মুসলমান ছিল অনুপস্থিত— শুধু তাই নয়, বৃহত্তর বঙ্গদেশের গ্রামীণ সমাজেরও কোনো যোগ ছিল না এর সঙ্গে। সেক্যুলার-চেতনাবিহীন বাংলার খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ এই নবজাগরণের সূত্রে গড়ে ওঠে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যা সমাজে জন্ম দেয় সাম্প্রদায়িকতা নামের বিষবৃক্ষের— যার কটু কথায় ফল জাতিবৈরতা। সংকীর্ণ ও রক্ষণশীল দৃষ্টির এই পরিবেশে অনিবার্যভাবে এসে যায় জাতিগত বিচ্ছিন্নতা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় পাল্টা মুসলিম জাতিগত-স্বাতন্ত্র্যবোধ ও সাম্প্রদায়িকতার। জাতীয় জীবনে এর পরিণাম হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর। যাঁরা এর ব্যতিক্রম ছিলেন বিদ্যাসাগর তাঁদের অন্যতম— উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে যাঁরা মজেছিলেন, বিদ্যাসাগর তাঁদের দোসর হতে পারেননি।
১৮২৯ সালে ৯ বছর বয়সে কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। পরের বছর ব্যাকরণের পাশাপাশি সংস্কৃত কলেজের ইংরেজি শ্রেণিতেও ভর্তি হন তিনি। সেখানে ইংরেজি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৮৩৪ সালে ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দীনময়ী দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৮৩৯ সালে এ কলেজে অধ্যয়নকালেই ঈশ্বরচন্দ্র ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পান। ১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর সে বছরই মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে প্রধান পণ্ডিতের পদে যোগ দেন বিদ্যাসাগর। ১৮৪৬ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ছেড়ে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। পরের বছর সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন বিদ্যাসাগর। সে বছরই হিন্দি ‘বেতাল পচ্চিসী’ অবলম্বনে রচিত তার প্রথম গ্রন্থ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’। এ গ্রন্থেই প্রথম বিরাম চিহ্নের সফল ব্যবহার করা হয়।

—সঞ্জয় ঘোষ



আজ বাংলার নবজাগরণের অনন্য পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। আজ তার জন্মের দ্বিশততম বর্ষপূর্তি। তাকে মনে করা হয় বাংলার প্রথম সার্থক গদ্যকার। তিনিই প্রথম বাংলালিপি সংস্কার করেছিলেন, যতিচিহ্নের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে ভাষার বিশৃঙ্খলা দূর করেছিলেন; তিনি যে শুধু বাংলা ভাষাকে যুক্তিগ্রাহ্য ও সবার বোধগম্য করে তুলেছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাঙালি সমাজে প্রগতিশীল সংস্কারের অনন্য অগ্রদূত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বাঙালির জাতীয় জীবনে বিদ্যাসাগরের চরিত্র চিরকালের জন্যে প্রতিষ্ঠা পাবে, কেননা যতই দিন যাবে, ততই তারা উপলব্ধি করবে, …দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’ বাংলা সাহিত্যে তার স্থান আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের এই কথা থেকে, ‘বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন ও সুসংহত করিয়া তাহাকে সহজ গতি ও কর্মকুশলতা দান করিয়াছিলেন।’
ঈশ্বরচন্দ্রের লক্ষ্যেই ছিল দেশের মানুষের সার্বিক প্রগতি। স্বেচ্ছায় পারিবারিক জীবন থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমশ আত্মীয়পরিজনহীন নিঃসঙ্গতার মধ্যেও আজীবন জনবিচ্ছিন্ন হননি। মানসিক আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তিক্ততাবোধে তাঁর জীবনের সেরা কাজ বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের জন্য একবার সখেদে বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন মাত্র, কিন্তু তা থেকে সরে থাকেননি। স্বনামধন্য সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতা দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্রের সুহৃদ ছিলেন। বারবার প্রতারিত হওয়ার পরে সেই পরম সুহৃদকে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না।’

—স্বপনকুমার মণ্ডল



প্রাতিষ্ঠানিক উপাধি কী ভাবে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে পারে, তার উদাহরণ ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য তিনি ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর জায়গায় ‘শর্ম্মা’ বা ‘শর্ম্মণঃ’ লিখতেন। তাঁর ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি শুধু তাঁর কৌলিক উপাধিই শুধু নয়, নামটিকে পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর গুণমুগ্ধবন্ধুকে নিয়ে যে সকল চিঠি লিখেছিলেন তা শুধু মুগ্ধতাই বয়ে আনে না, বহুরূপী ঈশ্বরচন্দ্রকে খুঁজে পাওয়া যায় সেখানে। সেখানেই ঈশ্বরচন্দ্রের বিদ্যাসাগর হওয়ার পাশাপাশি ‘করুণাসাগর’ হওয়ার হদিস মেলে। তবে আম বাঙালির ‘দয়ার সাগর’ বিশেষণে সুবাসিত হলেও তা বিদ্যাসাগরের মতো তা বিশেষ্য হতে পারেনি।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র (১৮৬৬) দু’টি সনেট ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়ে লেখা। প্রথমটিতে (‘বঙ্গদেশে এক মান্য বন্ধুর উপলক্ষে’) যাও-বা উহ্য ছিল, পরেরটিতে (‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’) তা শিরোনামে প্রকট হয়ে উঠেছে। মধু কবির মূল্যায়নেই ঈশ্বরচন্দ্রের বহুমুখী পরিচয়ের নিদান বর্তমান। ‘সমকালের সেরা ব্যক্তি’, ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ‘প্রাচীন মুনিঋষির মতো প্রজ্ঞা ও জ্ঞান’, ‘ইংরেজের মননশক্তি ও বাঙালি নারীর হৃদয়ের সমন্বয়’ প্রভৃতির মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্রের বহুধা ব্যাপ্ত ব্যক্তিত্বের পরিচয় উঠে এলেও সবগুলিই সমুদ্রগামী নদীর মতো বিদ্যাসাগরে মিলিত হয়েছে।
ইতালীয় রেনেসাঁসের সঙ্গে প্রায়ই বাংলার নবজাগরণের তুলনা করা হয়। ইতালীয় রেনেসাঁসের নায়কদেরও ছাড়িয়ে গেছে বিদ্যাসাগরের কীর্তি। তিনি ছিলেন পরাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। প্রখর আত্মমর্যাদা ও অসামান্য তেজস্বিতায়, বিপন্ন মানুষের দুর্দশা মোচনে, শিক্ষা বিস্তারে, নারী অধিকার রক্ষায় খাঁটি হিউম্যানিস্ট বিদ্যাসাগর ছিলেন অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’ সমাজসংস্কারে আধুনিকতার জাজ্ব্বল্যমান প্রতীক বিদ্যাসাগর ধর্মীয় অনাচার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন ইহজাগতিকতাকে প্রাধান্য দিয়ে। উপমহাদেশে ও বিশ্বের নানা স্থানে যখন সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন বিদ্যাসাগরের মানবকেন্দ্রিক ইহজাগতিকতাকে স্মরণ করা একান্ত জরুরি।

—রাজীব সরকার



উনিশ শতকের নবজাগরণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটে। এই নবজাগরণের প্রধান চরিত্র বিদ্যাসাগর। বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয় তিনি রেনেসাঁস পুরুষ। ইহজাগতিকতা, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা, নতুন গদ্যরীতি, সমাজসংস্কার, নারী শিক্ষার প্রসার, পাঠ্যসূচি থেকে অলৌকিকতার বিলুপ্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং মানবমুখিনতার মতো বৈশিষ্ট্য যা ইউরোপীয় রেনেসাঁসকে তুলে ধরেছিল— বিদ্যাসাগর তার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের মতে, বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। বাংলা গদ্যের জনক বিদ্যাসাগর সম্পর্কে সুকুমার সেনের মন্তব্য যথার্থ— ‘তিনি প্রচলিত ফোর্ট-উইলিয়মি পাঠ্যপুস্তকের বিভাষা, রামমোহন রায়ের পণ্ডিতি ভাষা এবং সমসাময়িক সংবাদপত্রের অপভাষা কোনটিকেই একান্তভাবে অবলম্বন না করিয়া তাহা হইতে যথাযোগ্য গ্রহণবর্জন করিয়া সাহিত্যযোগ্য লালিত্যময় সুডৌল যে গদ্যরীতি চালাইয়া দিলেন তাহা সাহিত্যের ও সংসারকার্যের সব রকম প্রয়োজন মিটাইতে সমর্থ হইল।’ পরবর্তীকালে বাংলা গদ্যের যে সুরম্য অট্টালিকা তৈরি হয়েছে এর ভিত্তি স্থাপন করেছেন বিদ্যাসাগরই।
বাংলাদেশে জনশিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। শিক্ষা সংসদের অনুরোধে তিনি সমগ্র দক্ষিণ বাংলা মডেল স্কুলের পাঠক্রম রচনা করেন, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির স্কুলসমূহের পাঠক্রম উন্নয়নে পালন করেন মুখ্য ভূমিকা। স্কুলে যাতে যথাযথ পাঠ-পদ্ধতি অনুসৃত হয়, সেজন্য তিনি ভারত সরকারকে বুঝিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মোদিনীপুরসহ নানা স্থানে তিনি দিবা ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত নৈশ বিদ্যালয়ে গ্রামের কৃষক, জেলে, কামার, কুমোর, জোলা— এসব শ্রমজীবী মানুষ পড়ালেখা করতেন। বিদ্যাসাগর স্কুলের শিক্ষকদের বেতন দিতেন নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে, স্কুল পরিচালনার জন্য তাকে ঋণগ্রস্তও হতে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিদ্যাসাগর কোনো বেতন নিতেন না, উপরন্তু পাঠোপকরণ তিনি নিজের অর্থে ক্রয় করে শিক্ষার্থীদের উপহার দিতেন। সাধারণ মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বলে উঠুক— এই-ই ছিল বিদ্যাসাগরের স্বপ্ন।

—বিশ্বজিৎ ঘোষ



হাজার বছরের ইতিহাসের ধারায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি। ভাবয়িত্রী এবং কারয়িত্রী প্রতিভা হিসেবে বাঙালি সমাজে তিনি সমধিক পরিচিত। জন্মের পর দুইশ’ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনও তিনি আমাদের কাছে নানামাত্রিকভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর চিন্তা এবং কর্ম বাঙালি চিন্তকদের নানাভাবে উদ্বুব্ধ করে, দুইশ’ বছরের কালগত দূরত্ব সত্ত্বেও। অব্যাহত এই প্রাসঙ্গিকতাই বিদ্যাসাগরের আধুনিকতার মৌল-সূত্র। জন্ম নিয়েছিলেন তিনি হুগলি জেলার প্রত্যন্ত পাড়াগাঁয়ে, কিন্তু উত্তরকালে আপন চিন্তা-কর্ম-সাধনা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কেন্দ্রের মানুষ। তৎকালীন সমাজে প্রান্তিক অবস্থান থেকে কেন্দ্রে উঠে আসাটা ছিল রীতিমতো এক যুদ্ধ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও অবতীর্ণ হতে হয়েছিল এই যুদ্ধে এবং লেখাই বাহুল্য, সে যুদ্ধে তিনি বিজয়ী।

পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পেয়েছিলেন পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুঃসাহসী এবং পরিশ্রমী চারিত্র্য, পেয়েছিলেন তার দৃঢ়সংকল্প ও সময়ানুবর্তিতার বৈশিষ্ট্য। মেরুদণ্ড সোজা করে লড়াই করার শক্তি তিনি পিতৃ-সূত্রেই অর্জন করেছিলেন। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের কাছ থেকে বিদ্যাসাগর লাভ করেছিলেন মানবসেবা ও দানশীলতার আন্তরপ্রেরণা— অর্জন করেছিলেন অনমনীয় তেজস্বিতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ সম্পর্কে বিদ্যাসগর লিখেছেন : ‘তিনি নিরতিশয় তেজস্বী ছিলেন; কোনো অংশে কাহারও নিকট অবনত হইয়া চলিতে, অথবা কোনও প্রকারে, অনাদর বা অবমাননা সহ্য করিতে পরিতেন না। তিনি, সকল স্থলে, সকল বিষয়ে, স্বীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তী হইয়া চলিতেন, অন্যদীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তন, তদীয় স্বভাব ও অভ্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।’ উত্তরকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রেও এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষ করা গেছে।
ধর্ম নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি-মাতামাতি ছিল বিদ্যাসাগরের চিন্তা-দৃষ্টিভঙ্গি ও আচারের সম্পূর্ণ বহির্ভূত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধর্মাচার করতেন না এবং ধার্মিকও ছিলেন না। অথচ ধর্মশাস্ত্র-সংস্কৃতে তার পাণ্ডিত্য ছিল অসামান্য।

—মযহারুল ইসলাম বাবলা



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশালত্ব আকাশচুম্বী। বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞানে, মননে, পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন অনন্য-অসাধারণ। বিদ্যা-শিক্ষা প্রসারে তার ভূমিকা প্রবাদতুল্য। সেই সময়কার পশ্চাৎপদ হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন করে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। বহু ক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্বে বাঙালি জাতি তাকে চিরদিন স্মরণে রাখবে।

তার অমরত্ব লুপ্ত হওয়ার নয়। চাঁদের বক্ষে যেমন কলঙ্ক না থাকলে চাঁদকে পরিপূর্ণ বলা যায় না। চাঁদের বক্ষে কতিপয় চিহ্নকে আমরা চাঁদের কলঙ্ক বলে অভিহিত করে থাকি। আমাদের সাহিত্যে তার বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রকৃতই ইহজাগতিক মানুষ ছিলেন। দেবদেবী কিংবা দেবদূত ছিলেন না, ওতে তার ন্যূনতম বিশ্বাসও ছিল না। আর অনিবার্যরূপে ছিলেন বাঙালি। তার মহান কীর্তির পাশাপাশি বিশেষ ক্ষেত্রে সীমারেখাও ছিল।
“তাহার জীবনে প্রথম হইতে ইহাই দেখা যায় যে, তাহার চরিত্র সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমাগতই যুদ্ধ করিয়া জয় লাভ করিয়াছে। তাহার মতো অবস্থাপন্ন ছাত্রের পক্ষে বিদ্যালাভ করা পরম দুঃসাধ্য, কিন্তু এই গ্রাম্য বালক শীর্ণ খর্ব দেহ এবং প্রকাণ্ড মাথা লইয়া আশ্চর্য অল্পকালের মধ্যে বিদ্যাসাগর উপাধিপ্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহার মতো দরিদ্রাবস্থার লোকের পক্ষে দান করা, দয়া করা বড় কঠিন; কিন্তু তিনি যখন যে অবস্থাতেই পড়িয়াছেন নিজের কোনো প্রকার অসচ্ছলতায় তাহাকে পরের উপকার হইতে বিরত করিতে পারে নাই, এবং অনেক মহিশ্চার্যশালী রাজা রায় বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান সেই ‘দয়ার সাগর’ নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া রহিলেন।”

—রাজীব সরকার



বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশায় ও পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। উনিশ শতকীয় নবজাগরণের অন্য কোনো মনীষীকে নিয়ে এত চর্চা হয়নি। যে কয়জন লেখক অসাধারণ নৈপুণ্যে বিদ্যাসাগরকে উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে থাকবে রবীন্দ্রনাথের নাম।

একটি চতুর্দশপদী কবিতা, চারটি প্রবন্ধ এবং বিদ্যাসাগর কলেজ পত্রিকায় বিদ্যাসাগর স্মরণে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মণিমুক্তা খচিত এ শ্রদ্ধার্ঘ্য সম্পর্কে আলোচনার আগে ফিরে যেতে হয় রবীন্দ্রনাথের শৈশবে। মাটির প্রতিমায় চক্ষুদান করেন পুরোহিত। বঙ্গ প্রতিমায় ‘চক্ষুদান’ করেছিল বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’। এই মহামূল্যবান বইয়ের সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছিল- “কেবল মনে পড়ে, জল পড়ে পাতা নড়ে তখন ‘কর’ ‘খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটাইয়া সবেমাত্র কূল পাইয়াছি। আমার জীবনের এইটেই আদি কবির প্রথম কবিতা।”

‘তিনি (রামসর্বস্ব পণ্ডিত) একদিন আমার ম্যাকবেথের তর্জমা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে শুনাইতে হইবে বলিয়া আমাকে তাহার কাছে লইয়া গেলেন। তখন তাহার কাছে রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বসিয়া ছিলেন। পুস্তকে ভরা তাহার ঘরের মধ্যে ঢুকিতে আমার বুক দুরুদুরু করিতেছিল; তাহার মুখচ্ছবি দেখিয়া যে আমার সাহসবৃদ্ধি হইল তাহা বলিতে পারি না। ইহার পূর্বে বিদ্যাসাগরের মতো শ্রোতা আমি তো পাই নাই; অতএব, এখান হইতে খ্যাতি পাইবার লোভটা মনের মধ্যে খুব প্রবল ছিল। বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম।’
vidyasagar.info ©