বাংলাদেশে জনশিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। শিক্ষা সংসদের অনুরোধে তিনি সমগ্র দক্ষিণ বাংলা মডেল স্কুলের পাঠক্রম রচনা করেন, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির স্কুলসমূহের পাঠক্রম উন্নয়নে পালন করেন মুখ্য ভূমিকা। স্কুলে যাতে যথাযথ পাঠ-পদ্ধতি অনুসৃত হয়, সেজন্য তিনি ভারত সরকারকে বুঝিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুল প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে মোদিনীপুরসহ নানা স্থানে তিনি দিবা ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত নৈশ বিদ্যালয়ে গ্রামের কৃষক, জেলে, কামার, কুমোর, জোলা— এসব শ্রমজীবী মানুষ পড়ালেখা করতেন। বিদ্যাসাগর স্কুলের শিক্ষকদের বেতন দিতেন নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে, স্কুল পরিচালনার জন্য তাকে ঋণগ্রস্তও হতে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিদ্যাসাগর কোনো বেতন নিতেন না, উপরন্তু পাঠোপকরণ তিনি নিজের অর্থে ক্রয় করে শিক্ষার্থীদের উপহার দিতেন। সাধারণ মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো জ্বলে উঠুক— এই-ই ছিল বিদ্যাসাগরের স্বপ্ন।
—বিশ্বজিৎ ঘোষ
হাজার বছরের ইতিহাসের ধারায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি। ভাবয়িত্রী এবং কারয়িত্রী প্রতিভা হিসেবে বাঙালি সমাজে তিনি সমধিক পরিচিত। জন্মের পর দুইশ’ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনও তিনি আমাদের কাছে নানামাত্রিকভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর চিন্তা এবং কর্ম বাঙালি চিন্তকদের নানাভাবে উদ্বুব্ধ করে, দুইশ’ বছরের কালগত দূরত্ব সত্ত্বেও। অব্যাহত এই প্রাসঙ্গিকতাই বিদ্যাসাগরের আধুনিকতার মৌল-সূত্র। জন্ম নিয়েছিলেন তিনি হুগলি জেলার প্রত্যন্ত পাড়াগাঁয়ে, কিন্তু উত্তরকালে আপন চিন্তা-কর্ম-সাধনা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কেন্দ্রের মানুষ। তৎকালীন সমাজে প্রান্তিক অবস্থান থেকে কেন্দ্রে উঠে আসাটা ছিল রীতিমতো এক যুদ্ধ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও অবতীর্ণ হতে হয়েছিল এই যুদ্ধে এবং লেখাই বাহুল্য, সে যুদ্ধে তিনি বিজয়ী।
পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পেয়েছিলেন পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুঃসাহসী এবং পরিশ্রমী চারিত্র্য, পেয়েছিলেন তার দৃঢ়সংকল্প ও সময়ানুবর্তিতার বৈশিষ্ট্য। মেরুদণ্ড সোজা করে লড়াই করার শক্তি তিনি পিতৃ-সূত্রেই অর্জন করেছিলেন। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণের কাছ থেকে বিদ্যাসাগর লাভ করেছিলেন মানবসেবা ও দানশীলতার আন্তরপ্রেরণা— অর্জন করেছিলেন অনমনীয় তেজস্বিতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা। পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ সম্পর্কে বিদ্যাসগর লিখেছেন : ‘তিনি নিরতিশয় তেজস্বী ছিলেন; কোনো অংশে কাহারও নিকট অবনত হইয়া চলিতে, অথবা কোনও প্রকারে, অনাদর বা অবমাননা সহ্য করিতে পরিতেন না। তিনি, সকল স্থলে, সকল বিষয়ে, স্বীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তী হইয়া চলিতেন, অন্যদীয় অভিপ্রায়ের অনুবর্তন, তদীয় স্বভাব ও অভ্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।’ উত্তরকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রেও এই বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষ করা গেছে।