মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন সত্যনিষ্ঠ একজন সাহসী মানুষ; তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তাই তিনি বলতেন এবং করতেন। সমাজে তিনি বিধবা বিবাহের জন্য দাবি তুলেছিলেন; তাঁর সে দাবি তিনি প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন। গোটা নারীজাতি এবং সমাজকে পথ দেখিয়ে নিজেও তিনি কখনো পিছিয়ে থাকেননি। নিজের একমাত্র ছেলে নারায়ণ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভব সুন্দরী নামে এক বিধবার সাথে তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন।

—ফরিদ আহমদ দুলাল



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন আজ থেকে দু’শবছর আগে। এই দু’শবছর ধরেই বিদ্যাসাগর বাঙালির জীবনে বেঁচে আছেন সরবে। জীবন, এমন এক সময়, যে সময়টাকে মানুষের কল্যাণে সঠিক ব্যবহার করতে পারলে মৃত্যু তাকে মেরে ফেলতে পারে না কোনোদিন; এবং সেখানেই জীবনের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। আমাদের অহংকার, বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি বঙ্গবন্ধুর বুকে বুলেট-মৃত্যু সেঁটে দিয়ে যারা ১৯৭৫-এ তাঁকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল; যারা দশকেরও অধিক সময় ধরে প্রতিদিন মেরে ফেলতে চেয়েছে শেখ মুজিবের নাম; তারা কি ব্যর্থ হয়ে যায়নি? তারা আজ কোথায়? ইতিহাসের কোন আঁস্তাকুড়ে ঠাঁই পেয়েছে তারা আজ? কিন্তু বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন তাঁর কীর্তি আর ত্যাগের মহিমায়। সাধারণেরা আয়ুষ্কাল ফুরালেই মরে যায়; কিন্তু কীর্তিমানেরা বেঁচে থাকেন মানুষের চিন্তায়-মননে আর সৃষ্টিশীলতায়। পৃথিবীতে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালির স্বাধীনতার সম্মান উজ্জীবিত থাকবে; ততদিন বাঙালির জাতিপিতার নাম উচ্চারিত হবে বাঙালির ঘরে ঘরে। একইভাবে বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, বাঙালি নারীর সম্মানবোধ যতদিন জাগরূক থাকবে, ততদিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম বাঙালি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে, ততদিন বাঙালিকে শরণাপন্ন হতে হবে তাঁর কাছে।
যাপিত জীবনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অসংখ্য কীর্তির পাশে বড় এক কীর্তি হচ্ছে বাংলা গদ্যভাষার আধুনিকায়ন। বলা যায়, তিনিই বাংলা গদ্যভাষায় গতি সঞ্চার করেছিলেন, আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, তিনিই বাংলা গদ্যভাষায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গদ্যের ভাষাতেও যে অদৃশ্য ছন্দ বিদ্যমান, গদ্যে প্রবহমানতার যে গতি, তা আবিষ্কার করেছিলেন তিনি; এবং বাংলা ভাষায় যতিচিহ্ন ব্যবহার করে গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী গতিকে সমন্বয় করার পথ দেখিয়েছিলেন; এভাবেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়ে উঠেছিলেন বাংলা গদ্য-ভাষার এক ঈশ্বর।

—ফরিদ আহমদ দুলাল



বোধ হবার পর আনন্দ পাই এই কথা ভেবে, ‘বর্ণ পরিচয়’ দিয়ে আমার শৈশবে বর্ণ পরিচয় হয়েছিল। সেদিন কি আর জানতাম কার হাত ধরে আমার বর্ণ পরিচয়ের যাত্রা শুরু হলো? যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে পরিচয় হলো, সেদিন বুঝলাম বাংলা গদ্য-ভাষার ঈশ্বর বিদ্যাসাগরের হাত ধরে চিনেছিলাম অ-আ-ক-খ। সেদিন কিছুটা তৃপ্তির পাশাপাশি দায়বদ্ধতাও অনুভব করেছিলাম; ভেবেছিলাম ঈশ্বরের আশীর্বাদকে সম্মান করা প্রয়োজন। তাই শুদ্ধতায় ব্রতী হয়েছিলাম। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার (বর্তমান মেদিনীপুর) বীরসিংহ গ্রামে। তাঁর পৈতৃক পদবী বন্দ্যোপাধ্যায়, যা ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধির আড়ালে খোয়া যায় সময়ের গৌরবের কাছে। সংস্কৃত কলেজ থেকে ১৮৪১-এ তিনি উচ্চতর শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করেন; তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বে মুগ্ধ কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করে। পাঠ্যপুস্তকে আমরা তাঁর মাতৃভক্তির কথা পড়েছি, সেখানেই জেনেছি মাতৃআজ্ঞা পালনে কী দুর্যোগের রাতে তিনি উত্তাল দামোদর সাঁতরে পাড়ি দিয়েছিলেন। ক্রমান্বয়ে জেনেছি সমাজসংস্কারক হিসেবে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ে প্রচলিত সতীদাহ প্রথা রোধ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন শৈশবে; বিধবাবিবাহ প্রচলন এবং শিক্ষা বিস্তারে নেতৃত্ব দিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন যৌবনে। সাংবাদিক হিসেবে সমাজে প্রচলিত অবিচার-অনাচার-দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন। তিনি যে কেবল বিধবাবিবাহের পক্ষে সরব ছিলেন, তাই নয়; নিজের ছেলেকেও তিনি বিয়ে করিয়ে ছিলেন একজন বিধবা নারীকে, সমাজ-পরিপার্শ্বে প্রবল আপত্তির মুখেও। পরবর্তীকালে তাঁর পুত্র যখন সেই স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছেদ করেন, তিনি তখন নিজের সম্পত্তি থেকে পুত্রকে বঞ্চিত করে পুত্রবধূকে দান করেন।
বিধবা বিবাহ চালু প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দীর্ঘ এক পুরাণ পাঠের দিকে অগ্রসর হয়েছেন, পুস্তক রচনা করেছেন। শুধু যুক্তি দিয়ে নয়, শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার দিকে মনোনিবেশ করেছেন বুঝেশুনেই। দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরেছিল বাঙালি হিন্দুসমাজ। প্রকৃত অর্থে বিদ্যাসাগরের পক্ষে হিন্দু পুরাণের নতুন ব্যাখ্যা ব্যতিরেকে বিধবা বিবাহ চালুকরণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করা কঠিন ছিল।

—মাজেদা মুজিব



উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মে নয় শুধু অন্যান্য ধর্মেও মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেবার প্রথা পুরনো। এই প্রথা থেকে বের হবার জন্য বিদ্যাসাগরের চেষ্টা দেখবো ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ প্রবন্ধে। নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন তেমনি নারী-পুরুষের প্রণয়ে বাল্যবিবাহ কীভাবে বাঁধ সাধে সে বিষয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন। বিদ্যাসাগরের প্রেমবোধ পুণ্য পর্যায়ের। বলাবাহুল্য, বাল্যবিবাহ নিয়ে বাংলাদেশে আইন আছে কিন্তু এখনো প্রায় ষাট শতাংশ মেয়ের বাল্যবিয়ে হয়। দেড়শো বছর আগে বিদ্যাসাগর পরিণত শরীরে পরিণত মন ও নারী-পুরুষের প্রণয়ের মধ্যে গড়ে ওঠা সংসারের কথা ভেবেছিলেন। এছাড়া একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শরীর যেমন করে উৎপাদনে অংশগ্রহণ করতে পারে না তেমনই এদেশীয় সাংসারিক আচারও তো তার জন্য কম কঠিন কিছু নয়!
সাগর-তর্পণ
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

বীরসিংহের সিংহশিশু!  বিদ্যাসাগর!  বীর!
উদ্‌বেলিত দয়ার সাগর-বীর্যে সুগম্ভীর!
সাগরে যে অগ্নি থাকে কল্পনা সে নয়,
তোমায় দেখে অবিশ্বাসীর হয়েছে প্রত্যয়।

নিঃস্ব হয়ে বিশ্বে এলে, দয়ার অবতার!
কোথাও তবু নোয়াওনি শির, জীবনে একবার!
দয়ায় স্নেহে ক্ষুদ্র দেহে বিশাল পারাবার,
সৌম্য মূর্তি তেজের স্ফূর্তি চিত্ত-চমৎকার!
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বঙ্গ সাহিত্যের রাত্রি স্তব্ধ ছিল তন্দ্রার আবেশে
অখ্যাত জড়ত্বভারে অভিভূত।  কী পুণ্য নিমেষে
তব শুভ অভ্যুদয়ে বিকীরিল প্রদীপ্ত প্রতিভা
প্রথম আশার রশ্মি নিয়ে এল প্রত্যূষের বিভা,
বঙ্গ ভারতীর ভালে পরাল প্রথম জয়টিকা।
রুদ্ধ ভাষা আঁধারের খুলিলে নিবিড় যবনিকা,
পণ্ডিতপ্রবর
শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

শুনেছি লোকের মুখে পীড়িত আপনি
হে ঈশ্বরচন্দ্র!  বঙ্গে বিধাতার বরে
বিদ্যার সাগর তুমি; তব সব মণি,
মলিনতা কেন কহ ঢাকে তার করে?
বিধির কি বিধি সুরি, বুঝিতে না পারি,
হেন ফুলে কীট কেন পশিবারে পারে?
করমনাশার স্রোত অপবিত্র বারি
ঢালি জাহ্নবীর গুণ কি হেতু নিবারে?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশালত্ব আকাশচুম্বী। বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-মনন-পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন অনন্যসাধারণ। বিদ্যা-শিক্ষা প্রসারে তার ভূমিকা প্রবাদতুল্য। সেই সময়কার পশ্চাৎপদ হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন করে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত করেছিলেন। বহুক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় বাঙালি জাতি তাকে চিরদিন স্মরণে রাখবে। তার অমরত্ব লুপ্ত হওয়ার নয়।

—মযহারুল ইসলাম বাবলা



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিশালত্ব আকাশচুম্বী। বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-মনন-পাণ্ডিত্যে তিনি ছিলেন অনন্যসাধারণ। বিদ্যা-শিক্ষা প্রসারে তার ভূমিকা প্রবাদতুল্য। সেই সময়কার পশ্চাৎপদ হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন করে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত করেছিলেন। বহুক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় বাঙালি জাতি তাকে চিরদিন স্মরণে রাখবে। তার অমরত্ব লুপ্ত হওয়ার নয়।

বিদ্যাসাগর প্রকৃত অর্থেই ইহজাগতিক মানুষ ছিলেন। দেবদেবী কিংবা দেবদূত ছিলেন না। ওতে তার বিশ্বাসও ছিল না। আর অনিবার্যরূপে তিনি ছিলেন বাঙালি। তার মহান কীর্তির পাশাপাশি বিশেষ ক্ষেত্রে সীমারেখাও ছিল। যে সীমা বা পরিসর তিনি অতিক্রম করতে পারেননি। রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন, তাই ত্রুটি-বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। একটি বিশেষ পরিসরের বৃত্তে আজীবন আবদ্ধ থেকেছেন। বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা করেননি।

তার নাম ঈশ্বরচন্দ্র ছিল বটে, কিন্তু তিনি ঈশ্বরকেন্দ্রিক ছিলেন না। ছিলেন মানবকেন্দ্রিক। এর বহু প্রমাণ রয়েছে তার জীবনজুড়ে। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদে থাকাকালে ওই কলেজে কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ শিক্ষার্থী ছাড়া অন্যদের প্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সংস্কৃত কলেজে যাতে কায়স্থ শিক্ষার্থীদের অন্তত পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়— ঈশ্বরচন্দ্র সেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এতে কলেজের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা চরম বিরোধিতা করেন। এ দলে তার ব্রাহ্মণ শিক্ষকরাও ছিলেন।
একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং প্রতিকূল ঔপনিবেশিক পরিবেশের মধ্যে অবস্থান করে বিদ্যাসাগর কীভাবে মনুষ্যত্বের চূড়ায় আরোহণ করতে পেরেছিলেন, তা আজকের বাঙালির কাছে বিস্ময় উদ্রেককারী বিষয়…

—খোন্দকার সিরাজুল হক



‘বিদ্যাসাগর’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ—‘সাগরের মতো ব্যাপক ও গভীর বিদ্যা যাঁর’। কিন্তু সমগ্র বাঙালি সমাজে বিদ্যাসাগর বলতে একজনকেই বোঝায়, যাঁর পিতৃদত্ত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এভাবেই আমরা পেয়েছি ‘বিশ্বকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘নেতাজী’, ‘দেশবন্ধু’, ‘শেরে বাংলা’, ‘বঙ্গবন্ধু’ প্রভৃতি উপাধির অনন্যসাধারণ ব্যক্তিবর্গকে, যাঁরা তাঁদের অসামান্য অবদানের জন্য পরিবারের গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র জাতির পথপ্রদর্শকরূপে বিবেচিত হয়েছেন। এ কারণেই দেশবাসী এই প্রিয় মানুষদের বিশেষভাবে সম্বোধন করে আনন্দ পেয়েছে। পরিতৃপ্ত হয়েছে। বিদ্যাসাগর বাঙালি সমাজের এমনই একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ, যিনি শিক্ষা বিস্তারে, সমাজ সংস্কারে ও সাহিত্য সাধনায় তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এবং মৃত্যু ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই কলকাতায়। আজ তাঁর ১২০তম মৃত্যুবার্ষিকী। আর কয়েক বছর পরেই ২০২০ সালে বাঙালি জাতি এই প্রতিভাধর মানুষটির দ্বিশত জন্মবার্ষিকী পালন করবে।
ভালো পাঠ্যবই মানসম্পন্ন শিক্ষার অন্যতম শর্ত। কিন্তু যোগ্য পাঠ্যবইয়ের বড়ো অভাব ছিল সেকালে। এই অভাব পূরণে বিদ্যাসাগর ও তার বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কার এগিয়ে আসেন। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ ও মদনমোহনের ‘শিশুশিক্ষা’ ছিল সম্প্রদায়নির্বিশেষ বাঙালির সূচনা-শিক্ষার হাতেখড়ির পুস্তিকা। আজও এর আবেদন নিঃশোষিত নয়। এর পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’, ‘ঋজুপাঠ’, ‘কথামালা’, ‘আখ্যানমঞ্জরী’র কথা কে ভুলতে চাইবেন! প্রাইমার-রচনার যে ধারা বিদ্যাসাগর প্রবর্তন করেছিলেন, তা-ই বাঙালির কাছে আদর্শ হয়ে উঠেছিল।

—আবুল আহসান চৌধুরী



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-৯১) উনিশ শতকের এক কীর্তিমান বাঙালি। সমাজসংস্কার, শিক্ষাপ্রসার, নারীর আলোকিত ভুবন-নির্মাণ, বাঙলা গদ্যের বিন্যাস ও পরিচর্যা, অমিতবীর্য পৌরুষ, গভীর মানবিক মূল্যবোধ, ‘দয়া’ ও ‘করুণা’র প্রকাশ, সেক্যুলার চেতনা— তাকে বাঙালি সমাজে স্বতন্ত্র পরিচয়ে চিহ্নিত করেছে।

উনিশ শতকের বাংলার জাগরণ বলতে যা বোঝায়, প্রকৃতপক্ষে তা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত বাঙালি জাগরণ। অন্য-অর্থে এ হলো বিত্ত ও বিদ্যার সমন্বয়ে নবচেতনায় প্রাণিত বাঙালি হিন্দুর সামাজিক উত্থান। এই যে নবজাগৃতি, কারণ বা ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, এর আলোকিত আঙিনায় বাঙালি মুসলমান ছিল অনুপস্থিত— শুধু তাই নয়, বৃহত্তর বঙ্গদেশের গ্রামীণ সমাজেরও কোনো যোগ ছিল না এর সঙ্গে। সেক্যুলার-চেতনাবিহীন বাংলার খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ এই নবজাগরণের সূত্রে গড়ে ওঠে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যা সমাজে জন্ম দেয় সাম্প্রদায়িকতা নামের বিষবৃক্ষের— যার কটু কথায় ফল জাতিবৈরতা। সংকীর্ণ ও রক্ষণশীল দৃষ্টির এই পরিবেশে অনিবার্যভাবে এসে যায় জাতিগত বিচ্ছিন্নতা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় পাল্টা মুসলিম জাতিগত-স্বাতন্ত্র্যবোধ ও সাম্প্রদায়িকতার। জাতীয় জীবনে এর পরিণাম হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর। যাঁরা এর ব্যতিক্রম ছিলেন বিদ্যাসাগর তাঁদের অন্যতম— উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে যাঁরা মজেছিলেন, বিদ্যাসাগর তাঁদের দোসর হতে পারেননি।
১৮২৯ সালে ৯ বছর বয়সে কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন ঈশ্বরচন্দ্র। পরের বছর ব্যাকরণের পাশাপাশি সংস্কৃত কলেজের ইংরেজি শ্রেণিতেও ভর্তি হন তিনি। সেখানে ইংরেজি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৮৩৪ সালে ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দীনময়ী দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৮৩৯ সালে এ কলেজে অধ্যয়নকালেই ঈশ্বরচন্দ্র ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি পান। ১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজে শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর সে বছরই মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে প্রধান পণ্ডিতের পদে যোগ দেন বিদ্যাসাগর। ১৮৪৬ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ছেড়ে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। পরের বছর সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি বইয়ের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন বিদ্যাসাগর। সে বছরই হিন্দি ‘বেতাল পচ্চিসী’ অবলম্বনে রচিত তার প্রথম গ্রন্থ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’। এ গ্রন্থেই প্রথম বিরাম চিহ্নের সফল ব্যবহার করা হয়।

—সঞ্জয় ঘোষ



আজ বাংলার নবজাগরণের অনন্য পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন। আজ তার জন্মের দ্বিশততম বর্ষপূর্তি। তাকে মনে করা হয় বাংলার প্রথম সার্থক গদ্যকার। তিনিই প্রথম বাংলালিপি সংস্কার করেছিলেন, যতিচিহ্নের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে ভাষার বিশৃঙ্খলা দূর করেছিলেন; তিনি যে শুধু বাংলা ভাষাকে যুক্তিগ্রাহ্য ও সবার বোধগম্য করে তুলেছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাঙালি সমাজে প্রগতিশীল সংস্কারের অনন্য অগ্রদূত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বাঙালির জাতীয় জীবনে বিদ্যাসাগরের চরিত্র চিরকালের জন্যে প্রতিষ্ঠা পাবে, কেননা যতই দিন যাবে, ততই তারা উপলব্ধি করবে, …দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’ বাংলা সাহিত্যে তার স্থান আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের এই কথা থেকে, ‘বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন ও সুসংহত করিয়া তাহাকে সহজ গতি ও কর্মকুশলতা দান করিয়াছিলেন।’
vidyasagar.info ©