বিদ্যাসাগর যে আধুনিক মানুষ ছিলেন, তার দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য তার সত্যিকারের আগ্রহ। সারা পৃথিবীতেই এখনো মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারটা সহজ হয়নি। আমাদের দেশে মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য এত রকম চেষ্টা চালানো হয় কিন্তু আমরা কি জানি এই দেশের হাই স্কুলের ছাত্রীদের শতকরা ৮০ ভাগ মেয়ে উত্ত্যক্তের শিকার হয়? আমাদের দেশের ছেলেরা যথেষ্ট সত্যবাদী, তাদের শতকরা ৯৭ জন স্বীকার করেছে, তারা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে একধরনের বিমলানন্দ পেয়ে থাকে! তার পরও স্কুল পর্যায়ে ছাত্র থেকে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি, সেজন্য মেয়েদের প্রশংসা করতেই হয়। কিছু মেয়ে যে ঝরে পড়ে না তা নয়, যারা ঝরে পড়ে তার ৭০ ভাগ থেকে বেশি মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় এই উত্ত্যক্তের কারণে। এখনো যদি এরকম অবস্থা হয়ে থাকে, ২০০ বছর আগে কী রকম অবস্থা ছিল আমরা সেটা কল্পনা করতে পারি। সেই সময়ে বিদ্যাসাগর এক বছরেরও কম সময়ে একটি নয়, দুইটি নয়, মেয়েদের জন্য ৩৫টি স্কুল খুলে ফেলেছিলেন। তার কাণ্ড দেখে ইংরেজ সাহেবেরা যখন সেসব স্কুলের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করল, তখন তিনি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন দিয়েছেন!
—মুহম্মদ জাফর ইকবাল
আমাদের ছেলেবেলায় আমরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর কিংবা মহাত্মা গান্ধীর মতো মানুষদের সঙ্গে নিয়ে বড় হয়েছি। ভালো করে কথা বলা শেখার আগে রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ করতে হয়েছে, কথা বলা শেখার পর নজরুলের কবিতা। ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে বিদ্যাসাগর পড়ালেখা করতেন এবং বাবার খাবার নষ্ট হবে বলে বিদ্যাসাগর কাউকে দেখতে না দিয়ে আস্ত তেলাপোকা চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছিলেন, সেই গল্পটি আমাদের অনেক বার শুনতে হয়েছে। (তখনই টের পেয়েছিলাম, আস্ত তেলাপোকা কখনো চিবিয়ে খেতে পারব না বলে আর যা-ই হই, কখনো বিদ্যাসাগর হতে পারব না।) শৈশবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে। তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগেই বিষাক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত, গান্ধি পোকার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম এবং কেউ ভালো করে বুঝিয়ে দেয়নি বলে আমি কিছুতেই বুঝতে পারতাম না, একটা পোকা কেমন করে এত ভালো ভালো কাজ করে। (এখন টের পাই, শৈশবে আমি অন্য বাচ্চাদের থেকে অনেক বেশি হাবাগোবা ছিলাম।)
অপরিণত বয়সে কিছু বোঝার বয়স হওয়ার আগেই এই ধরনের অসাধারণ মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজটি ঠিক হয়েছে, না ভুল হয়েছে সেটা নিয়ে বড় মানুষেরা বিতর্ক করতে পারেন কিন্তু আমাদের একটা বড় লাভ হয়েছে। এই ধরনের মানুষগুলোকে একধরনের আপন মানুষ ভেবে ভেবে বড় হয়েছি। নুতন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা হয়তো জুকারবার্গ কিংবা ইলন মাস্কের কথা জেনে রোমাঞ্চিত হয়, ১৯৭৫ থেকে ৯৬-এর সময়টিতে তারা সত্যিকারের বড় মাপের মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নামটি পর্যন্ত শোনার সুযোগ পায়নি। সেই তুলনায় আজকালকার শিশু-কিশোরেরা খানিকটা সৌভাগ্যবান, তারা অন্তত বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে পারছে, জানতে পারছে।
এই বছর বিদ্যাসাগরের জন্মের দুই শতবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। ২০০ বছর অনেক সময়। বিদ্যাসাগর পুরোনো কালের মানুষ, সেটা আমরা সবাই জানি কিন্তু তিনি যে ২০০ বছর আগের মানুষ, সেটা কখনোই সেইভাবে খেয়াল করিনি। কাজেই যখন বিষয়টা টের পেয়েছি তখন রীতিমতো চমকে উঠেছি। ২০০ বছর আগে এই দেশের মাটিতে এরকম একটা আধুনিক মানুষের জন্ম হয়েছিল? কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার!