বিদ্যাসাগরের রচনাগুলি নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন সাধারণভাবে আখ্যানমঞ্জরী-র তিনটি ভাগ শুধু উল্লেখ করা হয়। বিদ্যাসাগর বিভিন্ন বই থেকে নানান কাহিনি উদ্ধৃত করে সেগুলি সরল ভাষায় ছাত্রদের জন্য গ্রন্থনা করেন। প্রথম ভাগে একুশটি, দ্বিতীয় ভাগে ছাব্বিশটি ও তৃতীয় ভাগে কুড়িটি কাহিনি স্থান পেয়েছে। লেখাগুলি বেশ সুখপাঠ্য। রচনারীতি খানিকটা নতুন বলা যায়। বেশ ক’টি কাহিনি ঔপনিবেশিক নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার বিবরণ। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দিতে দেশ দখল করতে গিয়ে ইংরেজ, স্পেনীয় দখলকারেরা অধিকৃত দেশগুলির আদিবাসীদের ওপর যে-নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল, তারই পরিচয় তিনি দিয়েছেন। এই লেখাগুলি খুঁটিয়ে পড়লে ঔপনিবেশিকতাবাদীদের, বিশেষ করে ইংরেজ রবিনসন ক্রুসোদের, স্বরূপ বুঝতে অসুবিধে হয় না। তাঁর আগে বোধ হয় আর কেউ এমন উদ্ঘাটন করেননি। দু’একটি কাহিনির সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।
—পবিত্রকুমার সরকার
তালিবান নেতা মোল্লা মুহম্মদ ওমরের নির্দেশে ২০০১ সালের মার্চের একেবারে গোড়ার দিকে একদল ধর্মীয় সন্ত্রাসী আফগানিস্তানের বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেয়। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তিগুলোর একটি। দেড় হাজার বছরের ওই মূর্তি ঐতিহাসিক সৌকর্ষের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হত। ওই জায়গাটি ইউনেস্কো ঘোষিত ঐতিহ্যকেন্দ্র বা হেরিটেজ সাইট। বামিয়ান উপত্যকায় পাহাড়ের পৃষ্ঠতল কেটে-কেটে একদিন ওই বুদ্ধমূর্তি তৈরি হয়েছিল। মৌলবাদী অন্ধতার কাছে অবশ্য এই সবের দাম নেই। ইসলামের নামে এই সব কাণ্ডকারখানা চলেছিল। গোটা বিশ্ব ওই ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে যায়। পাকিস্তানসহ চুয়ান্নটি ইসলামিক রাষ্ট্র বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের নিন্দা করে। বর্তমানে সুইটজারল্যান্ডের উদ্যোগে ওই মূর্তি পুননির্মাণের চেষ্টা চলছে। মূর্তি নির্মাণ হলেও ঐতিহ্য ফিরে আসবে না।
২০০৩ সালে মার্কিনরা যখন ইরাক দখলে উন্মত্ত সামরিক অভিযান চালায়, ধ্বংস হয়েছিল সুমের ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী। এত বড় এবং এর তুল্য না-হলেও, একদা এই বাংলাতেও এই সব বোধবুদ্ধিহীন ঘটনা ঘটেছে রাজনৈতিক মৌলবাদের আশ্রয়ে। ১৯৬৯-৭০ আন্দোলনের পথ ধরে মাওবাদী (ওদের দাবি অনুযায়ী) কৃষক বিপ্লবের ধ্যানধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একদল তরুণ-তরুণী সংকল্পবদ্ধ হয়। ওদের নেতা ছিলেন চারু মজুমদার, সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু সান্যাল, সরোজ দত্ত, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখ। বহু মেধাবি উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রী সশস্ত্র বিপ্লবের কুহক-আকর্ষণে ঝাপিয়ে পড়ে। ওরা জোতদার-জমিদার-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার শাসন-শোষণ থেকে দেশকে দ্রুত মুক্ত করার লক্ষ্যে কলকাতা শহর-সহ রাজ্যের কয়েকটি অঞ্চলে চোরাগোপ্তা হামলা চালায় ও হত্যার আশ্রয় নেয়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের আগে লেনিন বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ক্রিয়াকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেন এবং একে ‘নারোদনিজম’ (রুশ দেশের ১৮৬০-৭০ সালে কৃষক অভ্যূত্থানভিত্তিক এই মতবাদ প্রচলিত। পরে এর পরিণতি হয় সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপে) আখ্যা দেন। তালিবানদের মতো এই বাংলার নকশালপন্থীরা স্কুল-কলেজ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার এবং ওদের শ্রেণি-উৎস বা মতাদর্শগত পার্থক্য যা-ই থাক না কেন, উভয়ের প্রয়োগ-পদ্ধতি একই ছিল। নকশালপন্থী নামে পরিচিত ওই ছাত্র-যুবরা স্বাধীনতা ও সংস্কার আন্দোলনে অর্জিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলি বিনির্মাণে নেমে পড়ে।
