দক্ষিণেশ্বরের পূজারীঠাকুরের একবার খেয়াল হ’ল সমুদ্রস্নানের, অমনি অযাচিতভাবে বাদুড়বাগানের বাড়িতে এসে হাজির সাগর-সঙ্গমে। প্রথম সম্ভাষণও অদ্ভুত রকমের। ‘এতদিন ছিলাম খালে-বিলে নদী-নালায়, এবার এসে পড়েছি একেবারে সাগরে’। উত্তরও ঠিক তেমনই, ‘তা বেশ, খানিকটা! নোনা পানি নিয়ে যান।’
—জনার্দন চক্রবর্তী
আমাদের ধারণার অনধিগম্য যে-সমস্ত বিষয় আছে বিদ্যাসাগরের মনুষ্যমহিমা নিশ্চয়ই তেমন একটি বিষয়। এমন একটি মহাজীবনের আলোকে আমরা কিছুটা আভাস পেতে পারি ভূমা কাকে বলে, ভূমৈব সুখং নাল্পে সুখমস্তি, এই সুচিরশ্রুত বাণীরই বা অর্থসঙ্কেত কি? তদ্ধিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। প্রণিপাত পরিপ্রশ্ন ও সেবা, এই তিনটি সিংহদ্বার অতিক্রম করে জ্ঞানী তত্ত্বদর্শীর উপদেশে অনুভূতির সেই রাজ্যে আমরা প্রবেশাধিকার পেতে পারি। এই মহামানবের বিস্ময়কর প্রতিভা ও বিদ্যাবত্তার পরিমাপ করবার বিগলিত করুণা-মন্দাকিনীর উৎস নির্দেশ করতে পারি এমন সেবা-সুকৃতিও জীবনে সঞ্চয় করা হয়নি। আমাদের সম্বল শুধু প্রণিপাত।
এই প্রণিপাত প্রত্যক্ষ করেছি বিদ্যাসাগরের করুণাসিন্ধুর তটস্থ মহাকবি শ্রীমধুসূদনে। কবির স্বানুভবের স্বচ্ছ দর্পণে প্রতিবিম্বিত হয়েছে এই বিরাট মনুষ্যমহিমা—
বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে,
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে
দীন যে, দীনের বন্ধু।
বিদ্যাসাগরের নিকটতম ব্যক্তিসান্নিধ্যে অবস্থান করে এই মহৎ উদার বিশাল কবিপ্রাণ স্বতঃস্ফুর্ত সুগভীর কৃতজ্ঞতার আবেশে জীবন-নাট্যের এক দুর্যোগসন্ধিতে সদ্যঃপরীক্ষালব্ধ নতুন ছন্দে এই কথাগুলি গেঁথেছিলেন। প্রাণসম্পদে রাজাধিরাজ এই মহাকবি নিজের দীনতার অকুণ্ঠ বৈষ্ণবজনোচিত স্বীকৃতি দিয়ে দেবমানবের মনুষ্যমহিমা এবং নামমহিমার কাব্যময় মহিম্নঃ স্তোত্র রচনা করেছিলেন।
