মোট পৃষ্ঠাদর্শন

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
        মাইকেল মধুসূদন দত্ত

  বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
  করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
  দীন যে, দীনের বন্ধু!—উজ্জ্বল জগতে
  হেমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে।
  কিন্তু ভাগ্যবলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
  যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
  সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
  গিরীশ। কি সেবা তার সে মুখ সদনে।—
  দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী;
  যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
  তরুদল, দাসরূপ ধরি;
  পরিমলে ফুলকুল দশ দিশ ভরে;
  দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
  নিশার সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে!

বিদ্যাসাগরী ভাষাকে এখন কেউ কেউ কঠিন ভাষা বলেন, কিন্তু আমরা যদি তাঁর সমকালীন লেখকদের রচনার পাশাপাশি রেখে দেখি, তবে নিশ্চয়ই স্বীকার করব, তাঁর ভাষা অতিশয় প্রাঞ্জল ও সুবোধ্য। অন্বয়গুণে প্রতিটি বাক্যের অর্থ সুস্পষ্টঃ শুধু তাই নয়, বিন্যাস-কৌশলে বাক্যগুলি সুললিত। বিষয়ের অনুরোধে স্থানে স্থানে তাঁকে গম্ভীর সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করতে হয়েছে, কিন্তু তাতে লালিত্য ক্ষুণ্ন হয়নি, এবং সন্ধি-সমাসের জটিলতায় অর্থ আচ্ছন্ন হয়নি।

—ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়



কর্মবীর রূপে যিনি সর্বজনবন্দিত, সাহিত্য-শিল্পীরূপেও তিনি রেখে গেছেন তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর। জীবনের যে সকল কর্তব্য বিদ্যাসাগরের কাছে সাহিত্য-রচনার চেয়ে বড়ো বলে মনে হয়েছিল, তার প্রতিই তিনি বিশেষভাবে মন দিয়েছিলেন। বই লেখা ছিল নানান কাজের মধ্যে একটি এবং তাও প্রধানতঃ প্রয়োজনের তাগিদে—কখনও বিদ্যার্থীদের জন্য, কখনও সমাজসংস্কারের উদ্দেশ্যে। তথাপি সাহিত্যসৌন্দর্যে মণ্ডিত তাঁর অনেক রচনা—বিশেষ, তাঁর সংস্কৃত কাব্যের ভাবানুবাদ— ‘শকুন্তলা’ ও ‘সীতার বনবাস’। ‘শকুন্তলা’র মূলে আছে কালিদাসের বিখ্যাত নাটক; আর ‘সীতার বনবাসে’র প্রথম দুই পরিচ্ছেদের উৎস ভবভূতির ‘উত্তররামচরিত’, অবশিষ্টাংশের উপাদান প্রধানত; বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ড থেকে নেওয়া। ‘রামের রাজ্যাভিষেক’ নামেও একখানি গ্রন্থ তিনি আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু তার কয়েক পৃষ্ঠার বেশী আর অগ্রসর হতে পারেননি। কাব্যানুবাদের বেলায় কেবল আখ্যান-বর্ণনা ও ভাব-পরিবেশনেই তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন মূল কাব্যের রস আহরণ করতে, গদ্যের চলনকেও ছন্দোময় করে তুলতে। বাক্যগঠনে অবহিত হলে শুধু যে অর্থকে সুবোধ্য করা যায়, তাই নয়, রচনাকে শ্রুতিমধুর ও তরঙ্গায়িত করে তোলা যায়, তার দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন।

‘এই গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চরমাণ জলধরপটল-সংযোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত; অধিত্যকাপ্রদেশ ঘনসন্নিবিষ্ট বনপাদপসমূহে সমাচ্ছন্ন থাকাতে, সতত স্নিগ্ধ, শীতল ও রমণীয়; পাদদেশে প্রসন্নসলিলা গোদাবরী তরঙ্গবিস্তার করিয়া প্রবল বেগে গমন করিতেছে।’ [সীতার বনবাস]—এ বাক্যের পর্বে পর্বে যে সুন্দর ধ্বনি-সামঞ্জস্য, তা তাঁর শিল্পবোধেরই অভ্রান্ত নিদর্শন।
দক্ষিণেশ্বরের পূজারীঠাকুরের একবার খেয়াল হ’ল সমুদ্রস্নানের, অমনি অযাচিতভাবে বাদুড়বাগানের বাড়িতে এসে হাজির সাগর-সঙ্গমে। প্রথম সম্ভাষণও অদ্ভুত রকমের। ‘এতদিন ছিলাম খালে-বিলে নদী-নালায়, এবার এসে পড়েছি একেবারে সাগরে’। উত্তরও ঠিক তেমনই, ‘তা বেশ, খানিকটা! নোনা পানি নিয়ে যান।’

—জনার্দন চক্রবর্তী



আমাদের ধারণার অনধিগম্য যে-সমস্ত বিষয় আছে বিদ্যাসাগরের মনুষ্যমহিমা নিশ্চয়ই তেমন একটি বিষয়। এমন একটি মহাজীবনের আলোকে আমরা কিছুটা আভাস পেতে পারি ভূমা কাকে বলে, ভূমৈব সুখং নাল্পে সুখমস্তি, এই সুচিরশ্রুত বাণীরই বা অর্থসঙ্কেত কি? তদ্ধিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া। প্রণিপাত পরিপ্রশ্ন ও সেবা, এই তিনটি সিংহদ্বার অতিক্রম করে জ্ঞানী তত্ত্বদর্শীর উপদেশে অনুভূতির সেই রাজ্যে আমরা প্রবেশাধিকার পেতে পারি। এই মহামানবের বিস্ময়কর প্রতিভা ও বিদ্যাবত্তার পরিমাপ করবার বিগলিত করুণা-মন্দাকিনীর উৎস নির্দেশ করতে পারি এমন সেবা-সুকৃতিও জীবনে সঞ্চয় করা হয়নি। আমাদের সম্বল শুধু প্রণিপাত।

এই প্রণিপাত প্রত্যক্ষ করেছি বিদ্যাসাগরের করুণাসিন্ধুর তটস্থ মহাকবি শ্রীমধুসূদনে। কবির স্বানুভবের স্বচ্ছ দর্পণে প্রতিবিম্বিত হয়েছে এই বিরাট মনুষ্যমহিমা—
                বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে,
                করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে
                দীন যে, দীনের বন্ধু।

বিদ্যাসাগরের নিকটতম ব্যক্তিসান্নিধ্যে অবস্থান করে এই মহৎ উদার বিশাল কবিপ্রাণ স্বতঃস্ফুর্ত সুগভীর কৃতজ্ঞতার আবেশে জীবন-নাট্যের এক দুর্যোগসন্ধিতে সদ্যঃপরীক্ষালব্ধ নতুন ছন্দে এই কথাগুলি গেঁথেছিলেন। প্রাণসম্পদে রাজাধিরাজ এই মহাকবি নিজের দীনতার অকুণ্ঠ বৈষ্ণবজনোচিত স্বীকৃতি দিয়ে দেবমানবের মনুষ্যমহিমা এবং নামমহিমার কাব্যময় মহিম্নঃ স্তোত্র রচনা করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ যাকে বিদ্যাসাগরের ‘অক্ষয় মনুষ্যত্ব’ বলেছেন তা তাঁর মানবিকতারই একটি দিক। তাঁর মানবসেবায় আত্মনিয়োগের কথা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। মানবপ্রীতিই তাঁর মূল প্রেরণা। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ যা বলতে চেয়েছিলেন তা হ’ল এই যে, তাঁর মানবসেবা কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

—হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়



ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একটি অনন্যসাধারণ চরিত্র। উনবিংশ শতাব্দীতে যে সকল ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের বাংলাদেশে আবির্ভাব হয়েছিল তাঁদের মধ্যেও তিনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিশেষভাবে চিহ্নিত ছিলেন। অগণিত গুণের বিচিত্র সমাবেশ নিয়ে তিনি একক মাহাত্ম্যে জীবনের পথে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে চলে গেছেন। তিনি যে আছেন তা জীবনের সকল ক্ষেত্রে সকলে অনুভব করেছে এবং সকলেরই শ্রদ্ধা তাঁর প্রতি আপনা হতে আকৃষ্ট হয়েছে। তাঁর জন্মের সার্ধশতবৎসর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর চরিত্রের একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করবার প্রস্তাব করি।

তাঁর সমসাময়িক মানুষদের মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েই এই মূল্যায়ন আরম্ভ করা যাক। মাইকেল মধুসূদন দত্ত শুধু তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না, বন্ধু ছিলেন। কাছে থেকে জানবার সুযোগ তাঁর যথেষ্ট হয়েছিল। তিনি বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে স্ত্রীর নিকট মন্তব্য করেছিলেন, বিদ্যাসাগর এমন একজন মানুষ ‘যাঁর মনীষা প্রাচীন ‌ঋষিদের মতো, কর্মদক্ষতা ইংরেজের মতো এবং হৃদয়বত্তা বাঙালী জননীর মতো।’ এই উক্তি যে অক্ষরে অক্ষরে তাঁর ওপর প্রযোজ্য তা তাঁর জীবনী হতেই প্রমাণিত হয়।
বিদ্যাসাগর একদিন শিবনাথ শাস্ত্রীকে বলিয়াছিলেন, “দেখ, ভারতবর্ষে এমন কোনো রাজা নাই যাহার নাকে এই চটিজুতাসুদ্ধ পায়ে টক্ করিয়া লাথি না মারিতে পারি।” শিবনাথ শাস্ত্রী লিখিয়াছেন, একথা শুনিয়া তাঁহার একটুও অবিশ্বাস হয় নাই।

—রাধারমণ মিত্র



৬.৪.১৮৪৬ হইতে ১৫.৭.১৮৪৭-এর মধ্যে কোনো এক সময়ের ঘটনা। বিদ্যাসাগর তখন সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক ও মিঃ জেমস্ কার হিন্দু কলেজের অধ্যক্ষ।

একদিন বিদ্যাসাগর কোনো প্রয়োজনে সংস্কৃত কলেজ হইতে হিন্দু কলেজে কার সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান। কার সাহেব তখন তাঁহার কামরায় সম্মুখস্থ টেবিলের উপর পাদুুকা-শোভিত পদযুগল সম্প্রসারিত করিয়া চেয়ারে বসিয়াছিলেন। বিদ্যাসাগরকে দেখিয়া পদযুগল নামাইলেনও না বা গুটাইলেনও না, বরং পায়ের দিকে যে চেয়ার ছিল অঙ্গুলিসংকেতে তাহাতে বিদ্যাসাগরকে বসিতে বলিলেন। সেই অবস্থায় কথাবার্তা সারিয়া বিদ্যাসাগর চলিয়া গেলেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরে কি প্রয়োজনে কার সাহেব সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান। বিদ্যাসাগর টেবিলের উপর তাহার তালতলার চটি-শোভিত পদযুগল কার সাহেবের দিকে প্রসারিত করিয়া দিয়া কথাবার্তা বলিলেন। এই ব্যবহারে কার সাহেব অত্যন্ত অপমানিত বোধ করিয়া উপরিওয়ালার নিকট নালিশ করিলেন। বিদ্যাসাগরের নিকট লিখিত কৈফিয়ৎ তলব করা হইলে তিনি উত্তরে যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা অবিকল ইংরাজিতেই উদ্ধৃত করিয়া দিলাম দুই কারণে; প্রথম, বাংলা অনুবাদে মূলের তীব্র ব্যঙ্গরস রক্ষা করা সম্ভব হইবে না; দ্বিতীয়, এই সময়ের মধ্যেই তিনি ইংরাজি রচনায় কিরূপ সিদ্ধহস্ত হইয়াছিলেন তাহা দেখাইবার জন্য।
সেই মহামানবের কর্মকীর্তির কথা আমি আর নূতন করিয়া কি বলিব, আর কতটুকুই বা বলিতে পারি? শুধু ইহাই বলিতে পারি—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বঙ্গজননীর শ্রেষ্ঠতম সন্তান। পৃথিবীর ইতিহাসেও ঠিক এমন একটি চরিত্রের মানুষ আমি খুঁজিয়া পাই নাই।

—আশুতোষ মুখোপাধ্যায়



আমার বয়স যখন দশ বৎসর, তখন আমি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে প্রথম দর্শন করি। সেই প্রথম দর্শনের স্মৃতি আমার মনে চিরজাগ্রত। সেই সময়ে তিনি আমাকে একখানি ‘রবিনসন ক্রুশো’ উপহার দিয়াছিলেন। তাঁহার নিজের হাতে দেওয়া সেই উপহারটি আমি সযত্বে এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে রক্ষা করিয়াছি তাহার পর আমার কর্ম-জীবনের আরম্ভে আমি আর-একবার তাঁহার সংস্পর্শে আসিয়াছিলাম। তখন তিনি আমাকে তাঁহার মেট্রোপলিটন কলেজে একটি অধ্যাপকের চাকরি দিয়াছিলেন।
বিদ্যাসাগরের উন্নত সুদৃঢ় চরিত্রে যাহা মেরুদণ্ড, সাধারণ বাঙালীর চরিত্রে তাহার একান্তই অসদ্ভাব। মেরুদণ্ডের অস্তিত্ব প্রাণীর পক্ষে সামর্থ্যের ও আত্মনির্ভরশক্তির প্রধান পরিচয়। বিদ্যাসাগর যে সামর্থ্য ও আত্মনির্ভরশক্তি লইয়া জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, সাধারণ বাঙালীর চরিত্রে তাহার তুলনা মিলে না।

—রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী



রত্নাকরের রামনাম উচ্চারণের ক্ষমতা ছিল না। অগত্যা ‘মরা’ ‘মরা’ বলিয়া তাঁহাকে উদ্ধার লাভ করিতে হইয়াছিল।

এই পুরাতন পৌরাণিক নজিরের দোহাই দিয়া আমাদিগকেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামকীর্তনে প্রবৃত্ত হইতে হইবে। নতুবা ঐ নাম গ্রহণ করিতে আমাদের কোনোরূপ অধিকার আছে কি না, এ বিষয়ে ঘোর সংশয় আরম্ভেই উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। বস্তুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এত বড় ও আমরা এত ছোট, তিনি এত সোজা ও আমরা এত বাঁকা যে, তাঁহার নাম গ্রহণ আমাদের পক্ষে বিষম আস্পর্ধার কথা বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে। বাঙালী জাতির প্রাচীন ইতিহাস কেমন ছিল, ঠিক স্পষ্ট জানিবার উপায় নাই। লক্ষ্মণসেনঘটিত প্রাচীন কিংবদন্তী অনৈতিহাসিক বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যাইতে পারে; কিন্তু পলাশির লড়াই-এর কিছুদিন পূর্ব হইতে আজ পর্যন্ত বাঙালী-চরিত্র ইতিহাসে যে স্থান লাভ করিয়া আসিয়াছে, বিদ্যাসাগরের চরিত্র তাহা অপেক্ষা এত উচ্চে অবস্থিত যে, তাঁহাকে বাঙালী বলিয়া পরিচয় দিতেই অনেক সময় কুণ্ঠিত হইতে হয়। বাগ্ যত, কর্মনিষ্ঠ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগরও আমাদের মতো! বাক্‌ সর্বস্ব সাধারণ বাঙালী, উভয়ের মধ্যে এত ব্যবধান যে, স্বজাতীয় পরিচয়ে তাঁহার গুণকীর্তন দ্বারা প্রকারান্তরে আত্মগৌরব খ্যাপন করিতে গেলে বোধহয় আমাদের পাপের মাত্রা আরও বাড়িয়া যাইতে পারে।
বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষা, প্রৌঢ়শিক্ষা, বিধবাবিবাহ— এ-সবকিছুর মাধ্যমে চেয়েছিলেন সামাজিক পরিবর্তন। তিনি জোর দিয়েছিলেন শিক্ষার উপর, কারণ তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষাই সামাজিক পরিবর্তনের জন্য মোক্ষম অস্ত্র। নারীশিক্ষা ও নারীর প্রতি সম্মান সমাজের গতিপথে উন্নতি আনবে। এক শিক্ষিতা নারী পরিবারের শিক্ষার জন্য দীপশিখা। আমাদের দায়িত্ব সেই অদ্ভুত আধুনিক মনোভাবাপন্ন বিদ্যাসাগরের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত করে রাখা।

—প্রমথেশ দাস


শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য উত্তম চরিত্র ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। এই লক্ষ্য নিয়ে যুগ যুগ ধরে সারা পৃথিবীতে শিক্ষাধারা অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে যদি উত্তম চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের মাপকাঠিতে বিচার করতে হয়, তখন একটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে দেখতে হয়, যে তার চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা ও আচার-আচরণের মধ্যে কী কী মূল্যবোধ, কত মাত্রায় বিদ্যমান বা প্রকাশ পাচ্ছে। যে-কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হলে আমরা তার শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র দেখি না, কিন্ত শিক্ষার প্রমাণ ও প্রভাব তার আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পায়। আচরণ অন্তর্নিহিত জ্ঞান, চিন্তা ও বিচারবুদ্ধির পরিপ্রকাশ। কোনো মনীষী শিক্ষার সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন— শিক্ষা হলো সেই জিনিস যা একজন মানুষের মধ্যে থেকে যায় যখন তার পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে এবং পড়ার বিষয়বস্তু ভুলে গেছে।

বিদ্যাসাগরের অনাড়ম্বর পোশাক এবং অতি সাধারণ চেহারার ভেতর থেকে প্রকাশ পেত অন্তর্নিহিত তেজ, প্রচণ্ড বিচারশক্তি এবং প্রগাঢ় মূল্যবোধের অভিব্যক্তি। যে-শিক্ষা তিনি পেয়েছেন বীরসিংহ গ্রামে, পরিবারে এবং কলকাতায়, তিনি তাঁর অতিমানস শক্তির দ্বারা সে-শিক্ষাকে নিজের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সুচারুভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সেই অতিমানস শক্তি তাঁকে শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে অদম্য প্রেরণা ও সাহস দিয়েছে। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মূল্যবোধের এক জীবন্ত উদাহরণ।
‘সাঁওতালরা তাঁকে তাদের ফসল উপহার দিত (শাকপাতা, কন্দ, মুল, কুদ্রুম), গরিবের যে-উপহার পেয়ে তিনি অশ্রপাত করেছেন। ১৮৮৮ অবধি তিনি কর্মাটাঁড়ে যেতেন, তার পরেও নিয়মিত খবরাখবর নিতেন ও মাসোহারা পাঠাতেন। বাংলোর মুখোমুখি, তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই উপমহাদেশের প্রথম দাতব্য আদিবাসী বালিকা বিদ্যালয় ও দাতব্য হোমিও চিকিৎসালয় চালু রয়েছে।

—ড. অর্চনা বন্দ্যোপাধ্যায়

              কুড়ি কুড়িকো নঁরঙা করমবুটে তিঁরিয়ঁ দ...
              (ওই শোনো মেয়েরা, করমগাছে করমবাঁশি বাজছে, চলো চলো)
              করো ত্বরা, করো ত্বরা, কাজ আছে মাঠ ভরা
              দেখিতে দেখিতে দিন আঁধার হবে।         —রবীন্দ্রনাথ।


জীবনের শেষ দিকে বিদ্যাসাগর কর্মাটাঁড় (অর্থাৎ, বিস্তীর্ণ কর্মভূমি বা করমগাছ-এর ডাঙা)-এ আঠারো বছর সাঁওতালদের মধ্যে কাটান। (হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, কর্মা নামে এক সাঁওতালের নামে কর্মাটাঁড়)। এখানে তিনি বিদ্যার গুরু নন, কর্মের পাহাড় করমবুরু বা কর্ম-দেবতা। ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের অনেক স্থানে বিভিন্ন গ্রামের এক নাম দেখা যায়, প্রধানত গাছের নামে, যেমন কর্মাটাঁড় (হলদু ও কেলিকদম), জামতাড়া, মাতকোমডিহি (মহুয়া), সারজংডিহি (শাল), সাপারমডিহি (শিউলিবনা)। এ ছাড়া, দুয়ারসিনি, যদুগোড়া, চকইচালান, ধুন্দিখাপ, ডাবা তোরাং, বাঘমুন্ডি, বুরুয়াকোচা, ঝালদা গ্রামগুলি ও আশপাশে কুমোরপাড়া, কামারপাড়া, পেটোপাড়া, তাঁতিপাড়া, গোয়ালপাড়ার বাসিন্দারা নিজেদের পেশা কাঠের কাজ, পাতার থালাবাটি, ঝুড়ি, খাটিয়া বোনার কাজ করে। কর্মনিপুণতা পরম্পরায় চর্চিত। চাষবাস, হস্তশিল্প হাটবারে কেনাবেচা, বিনিময় হয়। রোপণের পরের অবসরে, করম পরবের আগে, প্রধানত হস্তশিল্পের কাজ হয়।

হাওয়া বদল ও বিশ্রাম নিতে বিদ্যাসাগর বাঙালি-অধ্যুষিত দেওঘরের বড় বাড়ি কেনার চেয়ে নির্যাতিত, বিধ্বস্ত সাঁওতালদের মধ্যে থাকার জন্য এই কর্মাটাঁড়ের বৃক্ষবাগানসহ ছোট বাড়ি কেনা ঠিক করেন (১৮৬৯)। সাঁওতালরা ওখানকার সাত-আট ঘর দিকো (বহিরাগত) বা বাঙালিদের বিশ্বাস করত না, কারণ ভদ্রলোকদের কাছ থেকে তারা জিনিসের দাম বা শ্রমের মজুরি পেত না। বিদ্যাসাগর ন্যায্য মজুরি দিয়ে সাঁওতালদের আত্মীয়ের বিশ্বাস অর্জন করেন। সেই কালে প্রতি বছর হাজার টাকার বেশি খরচ করে কাপড়, শীতবস্ত্র, মোটা চাদর, কম্বল কিনে, কমলালেবু, খেজুর কলকাতা থেকে কিনে নিয়ে দিয়েছেন। রোগে ওষুধ, ভেষজ ও পথ্য দিয়েছেন। নিজ হাতে জমাদারনি কলেরা রোগীর, সাঁওতাল বালকের মলমুত্র পরিষ্কার করতে দ্বিধা করেননি। দুপুর রোদে তিন মাইল হেঁটে সাঁওতাল বালকের চিকিৎসা করেছেন। শিক্ষা, কর্ম, আনন্দে ভরা তাঁর বাগানবাড়ি। তাঁরই দেওয়া নাম নন্দন কানন-কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘মহর্ষির আশ্রম’ বলেছেন। নন্দন কাননে সকালে আম, লতানে আমের কলম ও আরও নানা ফলবৃক্ষরোপণ, বাগানের কাজ এবং খাওয়াদাওয়ার পরে আনন্দের নাচ হতো।
বিদ্যাসাগরের রচনাগুলি নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন সাধারণভাবে আখ্যানমঞ্জরী-র তিনটি ভাগ শুধু উল্লেখ করা হয়। বিদ্যাসাগর বিভিন্ন বই থেকে নানান কাহিনি উদ্ধৃত করে সেগুলি সরল ভাষায় ছাত্রদের জন্য গ্রন্থনা করেন। প্রথম ভাগে একুশটি, দ্বিতীয় ভাগে ছাব্বিশটি ও তৃতীয় ভাগে কুড়িটি কাহিনি স্থান পেয়েছে। লেখাগুলি বেশ সুখপাঠ্য। রচনারীতি খানিকটা নতুন বলা যায়। বেশ ক’টি কাহিনি ঔপনিবেশিক নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার বিবরণ। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দিতে দেশ দখল করতে গিয়ে ইংরেজ, স্পেনীয় দখলকারেরা অধিকৃত দেশগুলির আদিবাসীদের ওপর যে-নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল, তারই পরিচয় তিনি দিয়েছেন। এই লেখাগুলি খুঁটিয়ে পড়লে ঔপনিবেশিকতাবাদীদের, বিশেষ করে ইংরেজ রবিনসন ক্রুসোদের, স্বরূপ বুঝতে অসুবিধে হয় না। তাঁর আগে বোধ হয় আর কেউ এমন উদ্ঘাটন করেননি। দু’একটি কাহিনির সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।

—পবিত্রকুমার সরকার



তালিবান নেতা মোল্লা মুহম্মদ ওমরের নির্দেশে ২০০১ সালের মার্চের একেবারে গোড়ার দিকে একদল ধর্মীয় সন্ত্রাসী আফগানিস্তানের বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ডিনামাইট ফাটিয়ে উড়িয়ে দেয়। এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তিগুলোর একটি। দেড় হাজার বছরের ওই মূর্তি ঐতিহাসিক সৌকর্ষের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হত। ওই জায়গাটি ইউনেস্কো ঘোষিত ঐতিহ্যকেন্দ্র বা হেরিটেজ সাইট। বামিয়ান উপত্যকায় পাহাড়ের পৃষ্ঠতল কেটে-কেটে একদিন ওই বুদ্ধমূর্তি তৈরি হয়েছিল। মৌলবাদী অন্ধতার কাছে অবশ্য এই সবের দাম নেই। ইসলামের নামে এই সব কাণ্ডকারখানা চলেছিল। গোটা বিশ্ব ওই ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে যায়। পাকিস্তানসহ চুয়ান্নটি ইসলামিক রাষ্ট্র বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের নিন্দা করে। বর্তমানে সুইটজারল্যান্ডের উদ্যোগে ওই মূর্তি পুননির্মাণের চেষ্টা চলছে। মূর্তি নির্মাণ হলেও ঐতিহ্য ফিরে আসবে না।

২০০৩ সালে মার্কিনরা যখন ইরাক দখলে উন্মত্ত সামরিক অভিযান চালায়, ধ্বংস হয়েছিল সুমের ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসামগ্রী। এত বড় এবং এর তুল্য না-হলেও, একদা এই বাংলাতেও এই সব বোধবুদ্ধিহীন ঘটনা ঘটেছে রাজনৈতিক মৌলবাদের আশ্রয়ে। ১৯৬৯-৭০ আন্দোলনের পথ ধরে মাওবাদী (ওদের দাবি অনুযায়ী) কৃষক বিপ্লবের ধ্যানধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একদল তরুণ-তরুণী সংকল্পবদ্ধ হয়। ওদের নেতা ছিলেন চারু মজুমদার, সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু সান্যাল, সরোজ দত্ত, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখ। বহু মেধাবি উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রী সশস্ত্র বিপ্লবের কুহক-আকর্ষণে ঝাপিয়ে পড়ে। ওরা জোতদার-জমিদার-মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার শাসন-শোষণ থেকে দেশকে দ্রুত মুক্ত করার লক্ষ্যে কলকাতা শহর-সহ রাজ্যের কয়েকটি অঞ্চলে চোরাগোপ্তা হামলা চালায় ও হত্যার আশ্রয় নেয়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের আগে লেনিন বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ক্রিয়াকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেন এবং একে ‘নারোদনিজম’ (রুশ দেশের ১৮৬০-৭০ সালে কৃষক অভ্যূত্থানভিত্তিক এই মতবাদ প্রচলিত। পরে এর পরিণতি হয় সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপে) আখ্যা দেন। তালিবানদের মতো এই বাংলার নকশালপন্থীরা স্কুল-কলেজ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার এবং ওদের শ্রেণি-উৎস বা মতাদর্শগত পার্থক্য যা-ই থাক না কেন, উভয়ের প্রয়োগ-পদ্ধতি একই ছিল। নকশালপন্থী নামে পরিচিত ওই ছাত্র-যুবরা স্বাধীনতা ও সংস্কার আন্দোলনে অর্জিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলি বিনির্মাণে নেমে পড়ে।
অবহেলিতা নারীজাতির প্রতি নবজাগৃতির এই অগ্রদূতের যে কী অপরিসীম সহানুভূতি ও সমবেদনা ছিল, তার প্রমাণ মেলে বিদ্যাসাগরের জীবনচরিত-এ বারবার। শুধু বিধবাবিবাহ নয়, নারীত্বের অবমাননাকারী কৌলিন্য প্রথার বিরুদ্ধে, বহুবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম এবং সর্বোপরি বেথুন স্কুলের সম্পাদনাকাল হতে পরবর্তীকালে জেলায়-জেলায় মেয়েদের স্কুল স্থাপনা— এ-সবকিছুই নারীমুক্তির অগ্রণী অভিভাবক ঈশ্বরচন্দ্র চরিত্রের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছে।

—সোমেশ দাশগুপ্ত



মাইকেল এবং তাঁর ‘Vid’

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইংরেজি শিক্ষার সংস্পর্শে আলোকপ্রাপ্ত দুই বাঙালি প্রতিভা— ঈশ্বরচন্দ্র এবং মধুসূদন, একই সংস্কারমুক্ত, যুক্তিবাদী মানসিকতায় গড়ে উঠেছেন, আধুনিক মানবতাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। দুজনের কাজের মধ্যেই এই আদর্শবাদ এবং যুক্তিবাদী চেতনার স্বাক্ষর স্পষ্ট।

বিদ্যাসাগরের সীতার বনবাস এবং মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্য— এই উভয় রচনাতেই আর্যাবর্তের এ-যাবৎ কালের প্রধান নায়ক অযোধ্যার শ্রীরামচন্দ্র অবতারত্বের পদ থেকে নেমে সাধারণ মনুষ্যত্বের স্তরে এসে দাঁড়িয়েছেন।

সীতার বনবাস আলোচনার আগে আরও দুয়েকটি প্রাসঙ্গিক কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। এক, সীতার বনবাস বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সের রচনা। ১২৬৭ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৮৬০ এর ১৫ এপ্রিল) এর প্রথম প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের জন্মের এক বছর আগে। দুই, ওই ১৮৬০ সালের ২৪ এপ্রিল ঋষি রাজনারায়ণ বসুকে লেখা মধুসূদনের এক চিঠি থেকে জানতে পারি, তিলোত্তমাশর্মিষ্ঠা লেখার পরে মধুসূদনকে ‘একটি জাতীয় মহাকাব্য’, রচনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন রাজনারায়ণ। তিন, ১৮৬৩-এর ২৪ এপ্রিল থেকে ১৮৬১-র জুনের মধ্যে মেঘনাদবধ কাব্য— প্রথম খণ্ড (প্রথম পাঁচটি সর্গ) লেখা হয়। রবীন্দ্রনাথের জন্মের পর-পরই।
vidyasagar.info ©